-‘ওই ছেলেডার ভাবনচ্ছন আমার কাছে খুব এট্টা সুবিদের মনে হয় না। তোর বৌর সাথে ও যখন হাসাহাসি করে আমার শরীল বেমুণ্ডু এক্কেবারে জ্বলে যায়। উর মতলব ভালো নাই। সাবদান করে দিস। না হলি ককুন কী বুলে ফেলবুনি, স্যাকুন আবার ন্যাটা বাইদে যাবেনে।’ ছেলের উদ্দেশে কথাগুলো খুব ধমকের সুরেই বললেন কেসমত ব্যাপারী।
পিতার এসব কথা শুনে ছেলে সোলিম ক্ষেঁপে ওঠে। সে উল্টো ধমক দিয়ে বলে- ‘বাপ, তুমি মুরুব্বি হয়ে গেলে তাও দাঁইতলে না। যত্তসপ বেআক্কেলি কথাবাত্রা তুমার। রুবেল কি স্যারাম ছেলে। ও আমার এট্টা ম্যাট্টিকপাস বন্ধু। এই যুগির মানুষ অট্টুক হাসাহাসি করিই থাকে। তাছাড়া দেবর-ভাবীর ব্যাপার। বাপ, তুমি খবদ্দার অ্যারাম আবোল-তাবোল কতা আর বুলবা না কয়ে দিলাম।’
বিকেলে পিতা কেসমত ব্যাপারী আর ছেলে সোলিম গরুরগাড়িতে ছই বাঁধতে বাঁধতে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক বছর হলো সোলিমের বিয়ে হয়েছে ভেদামারী গ্রামে। ওদের কাবিলনগর থেকে প্রায় ৪ মাইল দূর। মাসখানেক আগে বউ মধুমালা বাপের বাড়িতে গিয়েছে। সোলিম কাল ভেদামারী যাবে তার বউকে আনতে। এ জন্যই তারা পিতা-পুত্র একসাথে গাড়িতে ছই বাঁধছিলো। মধুমালা যখন স্বামী সোলিমের বাড়িতে থাকে তখন এ বেলা ও বেলা আসে সোলিমের বন্ধু রুবেল। অকারণেই সে ঢু মারে। সোলিম যখন মাঠে থাকে তখনই তাকে বেশি দেখা যায় এ বাড়িতে। বেশ সেজেগুজে আসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসি তামাশা করে মধুমালার সাথে।
মধুমালা বাপের বাড়িতে যাওয়ার পর পুরো একমাস রবেলকে সোলিমদের বাড়িতে তেমন দেখা যায় না। কাল মধুমালা আসবে। রুবেল যেন আর এ বাড়িতে না আসে, সেজন্যই কেসমত ব্যাপারী ছেলেকে সাবধান করে দিচ্ছিলেন; কিন্তু সোলিম উল্টো পিতার ওপর চড়াও হয়। সে ওসব কথা মানতে নারাজ। বন্ধুর ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। রুবেল অমন ছেলে হতেই পারে না।
পরদিন ছইগাড়ি নিয়ে সোলিম শ্বশুরবাড়ি যায় বউ মধুমালাকে আনতে। গরুরগাড়ি বাড়ির কাছে পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই ছুটে আসে মধুমালা। মুখে এক চিলতে হাসি। স্বামীর ভালো-মন্দের খবর না নিয়েই সে জানতে চায়- রুবেল ভাই আসিনি?
না।
ক্যানে?
একুন তার পড়াশুনার চাপ। ইর পরেরবার আসপে। কথাগুলো বলতে বলতে গাড়ি থামায় সোলিম। রুবেল না আসার কারণে মধুমালার মন খারাপ হয়। যার জন্য সে কত কষ্ট করে সারাপাড়া খুঁজে খুঁজে রাজহাঁসের এক হালি ডিম কিনেছে। চৌকিতে বসিয়ে নিজ হাতে খাওয়াবে তাকে। যার জন্যে এতো পথ চেয়ে থাকা। সেই রুবেল না আসার কারণে হাসিতে ছেদ পড়ে মধুমালার। মায়াভরা মুখটা এক নিমেষেই ভার হয়ে যায়।
এবার বাপেরবাড়ি আসার সময় মধুমালার সাথে রুবেল বলেছিলো- ‘ভাবী, এবার সোলিমের সাথে তোমাকে আনতে যাবো।’ কিন্তু স্বামীর সাথে তাকে না দেখে বড্ড রাগ হয় মধুমালার। ‘আসপা না আসপা না। বিনিকাজে ভুগা দিবা ক্যানে। এরাম মানুষ আমার দুই চোকির বিষ।’ কথাগুলো বলতে বলতে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে মধুমালা। তবু কিছুই মনে করে না সেলিম।
তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। বেশ দূরের পথ। গাড়িতে ওঠার জন্য মধুমালাকে বারবার তাগিদ দেয় সোলিম। বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটা কুমড়ো, দুই আঁটি পুঁই, এক হাঁড়ি পাকান পিঠা আর এক ভাঁড় খেজুরের গুড় একে একে গাড়িতে তুলে দেন সোলিমের বৃদ্ধ দাদিশাশুড়ি। শাড়ি দিয়ে তৈরি খোলের ভেতর মুড়ি ভরে ঠিক একটি কোলবালিশের মতো বানিয়ে ফেলেন সোলিমের শ্বশুর। মুড়ির সাথে এক পোটলা মুড়কি, কয়েকটি ঝুনো নারকেল আরো কী সব গাড়িতে একে একে তুলে দেয়া হয়। আমড়াগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলো সোলিম। তার নজরে পড়লো রান্নাঘরের সামনে মা’র গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মধুমালা। তার কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে কী সব বলে বলে শাশুড়িও কাঁদছে।
না। এসব কান্নাকাটি সোলিমের একদম ভাল্লাগে না। অকারণে কেউ কাঁদলে ওর গা বিষিয়ে যায়। উহ! বেলা চলে যাচ্ছে। খিসমিস করে ওঠে সোলিম। শেষমেশ পাড়ার একদল মহিলা এসে মধুমালাকে ছইগাড়িতে তুলে দেয়। শ্বশুর এসে সোলিমের হাত ধরে বলে- ‘বাপ, মধুমালা ছোট মানুষ। ওকে দেকে-শুনে রাইকো। এট্টুআইডটু ভুলচুক হতি পারে, য্যানে কুনু নিন্দেমন্দ না হয়। তুমি কিচু বুলো না। আস্তে আস্তে সপ ঠিক হয়ে যাবে।’
পড়ন্ত বিকেল। গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে দেয় সোলিম। ধলা গরুটার লেজে মোচড় মারতেই গাড়ি এগিয়ে চলে। সোলিম হেসে হেসে রসের কথা বলে কিন্তু; তখনো মধুমালার চোখে কান্নাকাটির ছাপ। সে চুপ করে ছই গাড়ির মাঝখানে চুপটি করে বসে থাকে। গাড়ি প্রায় এক মাইল যাওয়ার পর মুখ খোলে মধুমালা। অনেক কথার ফাঁকে সোলিম মধুমালাকে বলে দেয়, পিতা কেসমত ব্যাপারীর মানা। সে যেন এবার রুবেলের সাথে বেশি মেলামেশা না করে। স্বামীর শাসানি শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে মধুমালা।
-‘তুমি এট্টা আস্ত চাষা বুলে অ্যারাম কতা বুলতি পাইল্লে। আমি কি স্যারাম বংশের মেয়ে। তুমার বাপ সারাজীবন গরুর দালালি করেচে। সেতো সন্দ করবিই। তুমি মিনসে মুক বুজে থাইকলে। কিছু বুলতি পাইল্লে না। এ্যাকন বাপের দোহাই দিয়ে ন্যাকামো কইরচো।’
মধুমালার ধমকানি শুনে চুপ করে থাকে সোলিম। সে বৌর ওপর রাগ না করে উল্টো মুচকি মুচকি হাসে।
‘আরে না, এসব কি আমি বুলচি। বাপ বুলেচে তাই তুমার জানালাম। খালি খালি আমার পোর ক্ষেঁপে যাইচ্চো।’ ঠাণ্ডা মাথায় হেসে হেসে বলে সোলিম।
তারপর অনেক কথা হয় দুজনের। সন্ধ্যের আজানের পর বাড়িতে পৌঁছায় গাড়ি।
মধুমালা এবার আসার পর থেকে সোলিমদের বাড়িতে রুবেলের আসা-যাওয়া আরো বেড়ে যায়। মধুমালা ও রুবেল আড্ডা মারে। হো হো করে হাসে। স্বামীর বারণকে আমল দেয় না মধুমালা। শ্বশুরকেও তোয়াক্কা করে না। সোলিমের অনুপস্থিতিতে তাদের এই মেলামেশা কেসমত ব্যাপারীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি রাগে গড়গড় করেন। কিন্তু ছেলের জন্য কিছু বলতে পারেন না। বিড়বিড় করে একা একা বলেন- ‘হাটে হাটে গরু কিনাবেচা করিচি। গরুর লেজ দেকলিই বুজি কুড়ে না তেজি। রুবেল আর মধুমালার এক ঘরে হাসাহাসি নিয়ে পাড়ার লোকেও ইদানীং কানাকানি করে। সন্দেহের চোখে দেখে অনেকেই। কিন্তু সহজে কেউ কিছু বলতে পারে না।
কাবিলনগর গ্রামের একজন গেরস্থ মানুষ কেসমত ব্যাপারী। মাঠান জমি আছে প্রায় ১০ বিঘা। দীর্ঘদিন গরুর ব্যবসা করেছেন। বয়স হয়েছে, তাই বছর দুয়েক আগে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। একরোখা মানুষ। যা বলেন তা করেন। সোলিমের বয়স যখন ৭ বছর তখন সোলিমের মা মারা যায় গুটিবসন্তে। বন্ধুদের সাথে বললেন আর বিয়ে করবো না। যে কথা সেই কাজ। জীবনে আর বিয়ে করলেন না। সংসারে বৃদ্ধ মা আর ছেলে সোলিমকে নিয়েই কাটিয়ে দিলেন ২০ বছর। মা মনি বেগম দু’ বছর আগে মারা গেলে বড্ড একা হয়ে পড়েন কেসমত ব্যাপারী। এরপরই সোলিমকে বিয়ে দিলেন ভেদামারী গ্রামে। যাতে পুত্রবধূকে নিয়ে মা হারানো শোক সামাল দেয়া যায়।
পুত্রবধূ মধুমালা দেখতে কেসমত ব্যাপারীর চোখে এক্কেবারে রাজরাণীর মতো। যেমনি চোখ দুটো, তেমনি মাথার চুল। শ্যামলা বরণ আর গোলগাল চেহারার মধুমালা যেন রূপকথার মধুমালা। কেসমত ব্যাপারী এমনটিই চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে সোলিমের ওপর খুব রাগ হয় তার। ‘এতো সুন্দর একটা বৌর কাছে কেউ বেগানা পুরুষকে একা থাকতে দেয়। আগুন আর খড় এক জায়গায় থাকলে কি না জ্বলে পারে? গাড়ল কনেগার। বুঝবি ঠিকই। যেদিন ঠেকপি।’ দাঁতের ওপর দাঁত রেখে বিড়বিড় করে কথাগুলো বলেন কেসমত ব্যাপারী।
সেদিন বিকেলে ঘরে ঢুকে সোলিমের মাথায় বাজ পড়লো। দেখলো মধুমালার গায়ে রুবেলের হাত। ছিঃ ছিঃ! সে এসব কী দেখলো। যে বন্ধুকে সে এতো বিশ্বাস করে তার এই কাজ! পিতার সতর্কবাণীগুলো পইপই করে মনে পড়ে তার। আসমান-জমিন এক হয়ে মাথাটা বনবন করে ঘুরে ওঠে সোলিমের। মনে হয় পুরো আকাশটা ভেঙে তার মাথায় পড়েছে। কী করবে সে কিছুই যেন ভেবে পায় না।
এ নিয়ে সেদিন রাতে সোলিম-মধুমালার মধ্যে কথায় কথায় ঝামেলা শুরু হয়। বৌকে আচ্ছা করে শাসিয়ে দেয় সোলিম। রুবেল যেন এ বাড়ির তেসীমানায় আর না আসে। কিন্তু না, কথায় কোনো কাজ হয় না। সোলিম মাঠেঘাটে গেলেই রুবেল সুযোগ বুঝে এ বাড়িতে আসে। মধুমালা ও রুবেলের মধ্যে অন্যরকম ঘনিষ্ঠতা জন্মে। সোলিমের সহ্য হয় না। গায়ে আগুন ধরে যায়। কী করবে ভেবে পায় না সে। এ কী বিশ্বাসঘাতকতা? এখন কী করার আছে? বৌ কি তার হাতছাড়া হয়ে যাবে? নানান প্রশ্নে বিদ্ধ হয় সোলিম।
সেদিন দুপুরে মাঠ থেকে ফেরে সোলিম। ঘাসের আঁটিটা মাথা থেকে নামিয়ে গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকেই ওর চক্ষু চড়কগাছ। মধুমালার ঘরে রুবেল। রাগে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে উঠলো সে। রাগ থামাতে পারলো না। কুলিন সাপের মতো ফস করে উঠলো সে। ধমক দিয়ে বন্ধুকে বললো- ‘বেরো লম্পট কনেগার।’
রুবেল কোনোদিন সোলিমের এমন রাগ দেখেনি। খুবই অবাক হলো রুবেল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার সময় বলে গেলো। ‘ঠিক আছে, তোর বাড়িতে আমি আর আসবো না, তবে এই অপমানের প্রতিশোধ নেবো। কথাটা মনে রাখিস।’
উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেসমত ব্যাপারী দু’ বন্ধুর উচ্চ বাক্যবিনিময় শুনলেন। মনে মনে খুব খুশি হলেন তিনি। যাক, এদ্দিন পর আমার গবেট ছেলের হুঁশ ফিরেছে।
বেশ কদিন কেটে যায়। রুবেল এ বাড়িতে আর আসে না। তবে মধুমালা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কথায় কথায় সোলিমের ওপর সে চড়াও হয়। ছাফ জানিয়ে দেয়। ‘বেশি প্যাট প্যাট করলি সে এ বাড়ির ভাত খাবে না। আজ হলিও না কাল হলিও না। রুবেল এট্টা ভালো ছেলে। এই গিরামে তার মতোন মানুষই নি। আর তার নামে যা তা বোলো লজ্জাও করে না?
সেদিন রাতে সোলিম ও মধুমালা এক ঘরেই ছিলো। ভোরের আজানের সময় আকস্মিক ঘুম ভেঙে যায় সোলিমের। এক পাশ থেকে অন্য পাশে ঘুরেই দেখে মধুমালা বিছানায় নেই। ধুচমুচ করে পাশমোড়া দিয়ে উঠে বসে সে। বুকের ভেতর ধড়ফড় করে ওঠে। হারিকেনটা জ্বালায়। না। মধুমালা নেই। তার বাকশোটাও নি। হারিকেনটা হাতে নিয়ে বাবার ঘরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোলিম। বাপ, ও বাপ মধুমালা ঘরে নেই। কেসমত ব্যাপারী বাঘের মতো ঝাপ দিয়ে ওঠেন।
কী হয়েছে রে?
:মধুমালা ঘরে নি, কনে চইলে গিয়েচে’।
নেই মানে, কনে গিয়েচে? সোলিমের মুখ দিয়ে কথা বোরোয় না। চোখ দিয়ে তার আগুন ছুটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে কী যেন একটা সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সিংহের মতো ঝাপ দিয়ে ঘরে ওঠে সে। চালের বাতা থেকে এক টানে ধারালো হেঁসোটাকে বের করে নেয়। দাঁতের ওপর দাঁত রেখে আকস্মিক চিল্লিয়ে ওঠে-আজ বন্ধুর একদিন, কী আমার একদিন। এরপর হাতের হারিকেনটা উঠোনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জোরকদমে রাস্তার দিকে বেরিয়ে যায় সোলিম।
(২০১০ খ্রি. বনানীবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা।)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন