শনিবার, ৪ জুন, ২০১১

হুঁশ

-‘ওই ছেলেডার ভাবনচ্ছন আমার কাছে খুব এট্টা সুবিদের মনে হয় নাতোর বৌর সাথে ও যখন হাসাহাসি করে আমার শরীল বেমুণ্ডু এক্কেবারে জ্বলে যায়উর মতলব ভালো নাইসাবদান করে দিসনা হলি ককুন কী বুলে ফেলবুনি, স্যাকুন আবার ন্যাটা বাইদে যাবেনে’ ছেলের উদ্দেশে কথাগুলো খুব ধমকের সুরেই বললেন কেসমত ব্যাপারী
            পিতার এসব কথা শুনে ছেলে সোলিম ক্ষেঁপে ওঠেসে উল্টো ধমক দিয়ে বলে- ‘বাপ, তুমি মুরুব্বি হয়ে গেলে তাও দাঁইতলে নাযত্তসপ বেআক্কেলি কথাবাত্রা তুমাররুবেল কি স্যারাম ছেলেও আমার এট্টা ম্যাট্টিকপাস বন্ধুএই যুগির মানুষ অট্টুক হাসাহাসি করিই থাকেতাছাড়া দেবর-ভাবীর ব্যাপারবাপ, তুমি খবদ্দার অ্যারাম আবোল-তাবোল কতা আর বুলবা না কয়ে দিলাম
             বিকেলে পিতা কেসমত ব্যাপারী আর ছেলে সোলিম গরুরগাড়িতে ছই বাঁধতে বাঁধতে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েপ্রায় এক বছর হলো সোলিমের বিয়ে হয়েছে ভেদামারী গ্রামেওদের কাবিলনগর থেকে প্রায় ৪ মাইল দূরমাসখানেক আগে বউ মধুমালা বাপের বাড়িতে গিয়েছেসোলিম কাল ভেদামারী যাবে তার বউকে আনতেএ জন্যই তারা পিতা-পুত্র একসাথে গাড়িতে ছই বাঁধছিলোমধুমালা যখন স্বামী সোলিমের বাড়িতে থাকে তখন এ বেলা ও বেলা আসে সোলিমের বন্ধু রুবেল অকারণেই সে ঢু মারে। সোলিম যখন মাঠে থাকে তখনই তাকে বেশি দেখা যায় এ বাড়িতেবেশ সেজেগুজে আসেঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসি তামাশা করে মধুমালার সাথে
মধুমালা বাপের বাড়িতে যাওয়ার পর পুরো একমাস রবেলকে সোলিমদের বাড়িতে তেমন দেখা যায় নাকাল মধুমালা আসবেরুবেল যেন আর এ বাড়িতে না আসে, সেজন্যই কেসমত ব্যাপারী ছেলেকে সাবধান করে দিচ্ছিলেন; কিন্তু সোলিম উল্টো পিতার ওপর চড়াও হয়সে ওসব কথা মানতে নারাজবন্ধুর ওপর তার অগাধ বিশ্বাসরুবেল অমন ছেলে হতেই পারে না
            পরদিন ছইগাড়ি নিয়ে সোলিম শ্বশুরবাড়ি যায় বউ মধুমালাকে আনতেগরুরগাড়ি বাড়ির কাছে পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই ছুটে আসে মধুমালামুখে এক চিলতে হাসি। স্বামীর ভালো-মন্দের খবর না নিয়েই সে জানতে চায়- রুবেল ভাই আসিনি?
না
ক্যানে?
একুন তার পড়াশুনার চাপইর পরেরবার আসপেকথাগুলো বলতে বলতে গাড়ি থামায় সোলিমরুবেল না আসার কারণে মধুমালার মন খারাপ হয়যার জন্য সে কত কষ্ট করে সারাপাড়া খুঁজে খুঁজে রাজহাঁসের এক হালি ডিম কিনেছেচৌকিতে বসিয়ে নিজ হাতে খাওয়াবে তাকেযার জন্যে এতো পথ চেয়ে থাকাসেই রুবেল না আসার কারণে হাসিতে ছেদ পড়ে মধুমালারমায়াভরা মুখটা এক নিমেষেই ভার হয়ে যায়

এবার বাপেরবাড়ি আসার সময় মধুমালার সাথে রুবেল বলেছিলো- ‘ভাবী, এবার সোলিমের সাথে তোমাকে আনতে যাবো’ কিন্তু স্বামীর সাথে তাকে না দেখে বড্ড রাগ হয় মধুমালার। ‘আসপা না আসপা নাবিনিকাজে ভুগা দিবা ক্যানেএরাম মানুষ আমার দুই চোকির বিষ।’ কথাগুলো বলতে বলতে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে মধুমালা তবু কিছুই মনে করে না সেলিম।

            তখন বিকেল গড়িয়ে গেছেবেশ দূরের পথগাড়িতে ওঠার জন্য মধুমালাকে বারবার তাগিদ দেয় সোলিমবাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটা কুমড়ো, দুই আঁটি পুঁই, এক হাঁড়ি পাকান পিঠা আর এক ভাঁড় খেজুরের গুড় একে একে গাড়িতে তুলে দেন সোলিমের বৃদ্ধ দাদিশাশুড়িশাড়ি দিয়ে তৈরি খোলের ভেতর মুড়ি ভরে ঠিক একটি কোলবালিশের মতো বানিয়ে ফেলেন সোলিমের শ্বশুরমুড়ির সাথে এক পোটলা মুড়কি, কয়েকটি ঝুনো নারকেল আরো কী সব গাড়িতে একে একে তুলে দেয়া হয়।  আমড়াগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলো সোলিমতার নজরে পড়লো রান্নাঘরের সামনে মা’র গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মধুমালাতার কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে কী সব বলে বলে শাশুড়িও কাঁদছে
নাএসব কান্নাকাটি সোলিমের একদম ভাল্লাগে নাঅকারণে কেউ কাঁদলে ওর গা বিষিয়ে যায়উহ! বেলা চলে যাচ্ছেখিসমিস করে ওঠে সোলিমশেষমেশ পাড়ার একদল মহিলা এসে মধুমালাকে ছইগাড়িতে তুলে দেয়শ্বশুর এসে সোলিমের হাত ধরে বলে- ‘বাপ, মধুমালা ছোট মানুষওকে দেকে-শুনে রাইকোএট্টুআইডটু ভুলচুক হতি পারে, য্যানে কুনু নিন্দেমন্দ না হয় তুমি কিচু বুলো না। আস্তে আস্তে সপ ঠিক হয়ে যাবে।’
পড়ন্ত বিকেলগরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে দেয় সোলিমধলা গরুটার লেজে মোচড় মারতেই গাড়ি এগিয়ে চলেসোলিম হেসে হেসে রসের কথা বলে কিন্তু; তখনো মধুমালার চোখে কান্নাকাটির ছাপসে চুপ করে ছই গাড়ির মাঝখানে চুপটি করে বসে থাকেগাড়ি প্রায় এক মাইল যাওয়ার পর মুখ খোলে মধুমালাঅনেক কথার ফাঁকে সোলিম মধুমালাকে বলে দেয়, পিতা কেসমত ব্যাপারীর মানাসে যেন এবার রুবেলের সাথে বেশি মেলামেশা না করে। স্বামীর শাসানি শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে মধুমালা
-‘তুমি এট্টা আস্ত চাষা বুলে অ্যারাম কতা বুলতি পাইল্লেআমি কি স্যারাম বংশের মেয়েতুমার বাপ সারাজীবন গরুর দালালি করেচেসেতো সন্দ করবিইতুমি মিনসে মুক বুজে থাইকলেকিছু বুলতি পাইল্লে নাএ্যাকন বাপের দোহাই দিয়ে ন্যাকামো কইরচো
মধুমালার ধমকানি শুনে চুপ করে থাকে সোলিমসে বৌর ওপর রাগ না করে উল্টো মুচকি মুচকি হাসে
‘আরে না, এসব কি আমি বুলচিবাপ বুলেচে তাই তুমার জানালামখালি খালি আমার পোর ক্ষেঁপে যাইচ্চো।’ ঠাণ্ডা মাথায় হেসে হেসে বলে সোলিম
তারপর অনেক কথা হয় দুজনেরসন্ধ্যের আজানের পর বাড়িতে পৌঁছায় গাড়ি
মধুমালা এবার আসার পর থেকে সোলিমদের বাড়িতে রুবেলের আসা-যাওয়া আরো বেড়ে যায়মধুমালা ও রুবেল আড্ডা মারেহো হো করে হাসে। স্বামীর বারণকে আমল দেয় না মধুমালাশ্বশুরকেও তোয়াক্কা করে নাসোলিমের অনুপস্থিতিতে তাদের এই মেলামেশা কেসমত ব্যাপারীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়তিনি রাগে গড়গড় করেনকিন্তু ছেলের জন্য কিছু বলতে পারেন নাবিড়বিড় করে একা একা বলেন- ‘হাটে হাটে গরু কিনাবেচা করিচিগরুর লেজ দেকলিই বুজি কুড়ে না তেজিরুবেল আর মধুমালার এক ঘরে হাসাহাসি নিয়ে পাড়ার লোকেও ইদানীং কানাকানি করে সন্দেহের চোখে দেখে অনেকেই। কিন্তু সহজে কেউ কিছু বলতে পারে না।
            কাবিলনগর গ্রামের একজন গেরস্থ মানুষ কেসমত ব্যাপারীমাঠান জমি আছে প্রায় ১০ বিঘাদীর্ঘদিন গরুর ব্যবসা করেছেনবয়স হয়েছে, তাই বছর দুয়েক আগে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনিএকরোখা মানুষযা বলেন তা করেনসোলিমের বয়স যখন ৭ বছর তখন সোলিমের মা মারা যায় গুটিবসন্তে। বন্ধুদের সাথে বললেন আর বিয়ে করবো নাযে কথা সেই কাজজীবনে আর বিয়ে করলেন নাসংসারে বৃদ্ধ মা আর ছেলে সোলিমকে নিয়েই কাটিয়ে দিলেন ২০ বছরমা মনি বেগম দু’ বছর আগে মারা গেলে বড্ড একা হয়ে পড়েন কেসমত ব্যাপারীএরপরই সোলিমকে বিয়ে দিলেন ভেদামারী গ্রামেযাতে পুত্রবধূকে নিয়ে মা হারানো শোক সামাল দেয়া যায়
পুত্রবধূ মধুমালা দেখতে কেসমত ব্যাপারীর চোখে এক্কেবারে রাজরাণীর মতোযেমনি চোখ দুটো, তেমনি মাথার চুলশ্যামলা বরণ আর গোলগাল চেহারার মধুমালা যেন রূপকথার মধুমালাকেসমত ব্যাপারী এমনটিই চেয়েছিলেনকিন্তু ছেলে সোলিমের ওপর খুব রাগ হয় তার। ‘এতো সুন্দর একটা বৌর কাছে কেউ বেগানা পুরুষকে একা থাকতে দেয়। আগুন আর খড় এক জায়গায় থাকলে কি না জ্বলে পারে? গাড়ল কনেগারবুঝবি ঠিকইযেদিন ঠেকপি।’ দাঁতের ওপর দাঁত রেখে বিড়বিড় করে কথাগুলো বলেন কেসমত ব্যাপারী
             সেদিন বিকেলে ঘরে ঢুকে সোলিমের মাথায় বাজ পড়লোদেখলো মধুমালার গায়ে রুবেলের হাতছিঃ ছিঃ! সে এসব কী দেখলোযে বন্ধুকে সে এতো বিশ্বাস করে তার এই কাজ! পিতার সতর্কবাণীগুলো পইপই করে মনে পড়ে তারআসমান-জমিন এক হয়ে মাথাটা বনবন করে ঘুরে ওঠে সোলিমের মনে হয় পুরো আকাশটা ভেঙে তার মাথায় পড়েছে। কী করবে সে কিছুই যেন ভেবে পায় না।
এ নিয়ে সেদিন রাতে সোলিম-মধুমালার মধ্যে কথায় কথায় ঝামেলা শুরু হয়বৌকে আচ্ছা করে শাসিয়ে দেয় সোলিমরুবেল যেন এ বাড়ির তেসীমানায় আর না আসেকিন্তু না, কথায় কোনো কাজ হয় নাসোলিম মাঠেঘাটে গেলেই রুবেল সুযোগ বুঝে এ বাড়িতে আসেমধুমালা ও রুবেলের মধ্যে অন্যরকম ঘনিষ্ঠতা জন্মেসোলিমের সহ্য হয় নাগায়ে আগুন ধরে যায়কী করবে ভেবে পায় না সে এ কী বিশ্বাসঘাতকতা? এখন কী করার আছে? বৌ কি তার হাতছাড়া হয়ে যাবে? নানান প্রশ্নে বিদ্ধ হয় সোলিম।

সেদিন দুপুরে মাঠ থেকে ফেরে সোলিমঘাসের আঁটিটা মাথা থেকে নামিয়ে গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকেই ওর চক্ষু চড়কগাছমধুমালার ঘরে রুবেলরাগে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে উঠলো সেরাগ থামাতে পারলো নাকুলিন সাপের মতো ফস করে উঠলো সে। ধমক দিয়ে বন্ধুকে বললো- ‘বেরো লম্পট কনেগার

রুবেল কোনোদিন সোলিমের এমন রাগ দেখেনিখুবই অবাক হলো রুবেলসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলোযাওয়ার সময় বলে গেলো‘ঠিক আছে, তোর বাড়িতে আমি আর আসবো না, তবে এই অপমানের প্রতিশোধ নেবোকথাটা মনে রাখিস
উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেসমত ব্যাপারী দু’ বন্ধুর উচ্চ বাক্যবিনিময় শুনলেনমনে মনে খুব খুশি হলেন তিনিযাক, এদ্দিন পর আমার গবেট ছেলের হুঁশ ফিরেছে
             বেশ কদিন কেটে যায়রুবেল এ বাড়িতে আর আসে নাতবে মধুমালা বেপরোয়া হয়ে ওঠেকথায় কথায় সোলিমের ওপর সে চড়াও হয়ছাফ জানিয়ে দেয়। ‘বেশি প্যাট প্যাট করলি সে এ বাড়ির ভাত খাবে নাআজ হলিও না কাল হলিও না রুবেল এট্টা ভালো ছেলে। এই গিরামে তার মতোন মানুষই নি। আর তার নামে যা তা বোলো লজ্জাও করে না?
সেদিন রাতে সোলিম ও মধুমালা এক ঘরেই ছিলোভোরের আজানের সময় আকস্মিক ঘুম ভেঙে যায় সোলিমেরএক পাশ থেকে অন্য পাশে ঘুরেই দেখে মধুমালা বিছানায় নেইধুচমুচ করে পাশমোড়া দিয়ে উঠে বসে সেবুকের ভেতর ধড়ফড় করে ওঠেহারিকেনটা জ্বালায়নামধুমালা নেইতার বাকশোটাও নিহারিকেনটা হাতে নিয়ে বাবার ঘরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোলিমবাপ, ও বাপ মধুমালা ঘরে নেইকেসমত ব্যাপারী বাঘের মতো ঝাপ দিয়ে ওঠেন
কী হয়েছে রে?
:মধুমালা ঘরে নি, কনে চইলে গিয়েচে’
নেই মানে, কনে গিয়েচে? সোলিমের মুখ দিয়ে কথা বোরোয় নাচোখ দিয়ে তার আগুন ছুটে যায়মুহূর্তের মধ্যে কী যেন একটা সিদ্ধান্ত নেয়এরপর সিংহের মতো ঝাপ দিয়ে ঘরে ওঠে সেচালের বাতা থেকে এক টানে ধারালো হেঁসোটাকে বের করে নেয়দাঁতের ওপর দাঁত রেখে আকস্মিক চিল্লিয়ে ওঠে-আজ বন্ধুর একদিন, কী আমার একদিনএরপর হাতের হারিকেনটা উঠোনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জোরকদমে রাস্তার দিকে বেরিয়ে যায় সোলিম। 
(২০১০ খ্রি. বনানীবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা।)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন