ঝুনু চাচা। বিশ্বাস বংশের মানুষ। শিক্ষা দীক্ষা আর ভদ্রতায় বিশ্বাসরা গ্রামের সেরা। তবে একটু কূটকৌশলী তারা। কথায় কথায় গোষ্ঠীর বড়াই করে। ঝুনু চাচা তাদের একজন। তিনি তেমন লেখাপড়া জানেন না। পেশায় কৃষক। তবে বেশ বুদ্ধি রাখেন। তার নাকি গিটে গিটে বুদ্ধি। সহজে তাকে কেউ হারাতে পারে না। খুব হিসেবি মানুষ আর কি। পরের ফাঁকি দেবেন কিন্তু নিজে ফাঁকে পড়বেন না।
সেদিন বিকেলে গরুরগাড়িতে করে শ্যালোমেশিন নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন ঝুনু চাচা। সোনাতনপুরের মাঠে ছিল ওই শ্যালোমেশিন। তার গরুরগাড়ির পেছন পেছন আসছিল গ্রামের বালক কুদ্দুস আলী। সে তার বাবার জন্য মাঠে খাবার নিয়ে গিয়েছিল। গরুরগাড়ি প্রধান সড়কে উঠলে কুদ্দুস সামনে তাকিয়ে দেখলো কয়েকটি ছাগলে একজন চাষীর সরিষাক্ষেত খেয়ে যাচ্ছে। তার বালক মনে দয়া হলো। সে ছাগলগুলোকে হাঁক দিয়ে তাড়ালো। রাস্তা পার হলেই ছাগল মালিকের বাড়ি। কুদ্দুসের হাঁক শুনে ছাগলগুলো ভয় পেলো। ছাগলগুলো দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে ঘঠলো বিপত্তি। একটি গাভীন ছাগল ঝুনু চাচার গরুর পেটের তল দিয়ে রাস্তা পার হতে যায়। অমনিই একটি গরুর লাথি খেয়ে পড়ে চাকার নিচে। গাড়ির একটি চাকা ছাগলের পেটের ওপর দিয়ে চলে যায়। ছাগলটি প্যা প্যা করে ডাকতে ডাকতে ঢুকে যায় বাড়িতে। ঝুনু চাচা আফসোস করেন। ইশ ছাগলটা কি মারাই যায়!
তখন সন্ধ্যা। মরা ছাগল নিয়ে গ্রামের সমাজের কাছে বিচার চাইতে আসে ধোনাইগঞ্জের রবগুল। তার দাবি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন গ্রামের এক বালক ইট দিয়ে মাথায় মেরে ছাগলটাকে মেরে ফেলেছে। কোন বালক? দোষ পড়লো কুদ্দুসের ওপর। কথাটা যখন কুদ্দুস শোনে তখন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কই সেতো ছাগলটাকে মারেনি। তার নামে কেন দোষ হলো? বসে বসে কাঁদে কুদ্দুস।
কুদ্দুস চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বাবা কদম আলী খুবই গরিব। জনপাট খেটে তার সংসার চলে। ছেলে কুদ্দুস পরের ছাগল মেরে ফেলেছে শুনে তার খুব মন খারাপ হয়। এ জন্যই কি তাকে স্কুলে দিয়েছি। কুদ্দুস কেঁদে কেঁদে বাবাকে বোঝায় সে ছাগল মারেনি। ঝুনু চাচা সাক্ষী আছে। ঝুনু চাচার গাড়ির নিচে পড়েই না ছাগলটি মরেছে। কে শোনে কার কথা। ছেলের ওপর ক্ষেপে যায় কদম আলী। সে কুদ্দুসের দু গাল চড়িয়ে লাল করে দেয়। তার হাত চিনচিন করতে থাকে। কুদ্দুস ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কাউকেই সে বোঝাতে পারে না। ছেলের ওপর খুব মায়া হয় কদম আলীর। সে কোনোদিন ছেলের গায়ে হাত তোলেনি। আজ না তুলে আর পারলো না সে। কুদ্দুসের কিশোর মনে প্রশ্ন আসে মানুষের উপকার করাই কি অপরাধ। সে কেন পরের ক্ষেত থেকে ছাগল তাড়াতে গেল?
সন্ধ্যার পর বিশ্বাসদের খানকা ঘরে সালিস মিটিং। ছাগল মারার বিচার হবে। কুদ্দুস ও তার বাবা কদম আলীকে চৌকিদার ডাকতে আসে। বালক কুদ্দুস ভয়ে কাঁপতে থাকে। তার গায়ে জ্বর বয়ে যায়। সে তার মাকে জানায় মাগো জাড় লাগছে। তাদের তেমন গরম পোশাক নেই। তার মায়ের একটি ময়লা শাড়ি ভাঁজ করে তার মা কুদ্দুসের গায়ে জড়িয়ে গলায় গিঁট দিয়ে বেঁধে দেয়।
এশার নামাজের পর বাবার সাথে সালিসে হাজির হয় বালক কুদ্দুস। এক কোণায় ছেলেকে সাথে নিয়ে কদম আলী বসার জায়গা করে নেয়। খানকাঘরে শতাধিক লোক। বিচারে সবাই ঝুনু চাচার পক্ষে হয়। ঝুনু চাচা স্পষ্ট জানিয়ে দেন কুদ্দুস ইট দিয়ে ছাগলের মাথায় মেরেছে। এ কারণেই ছাগলটি মারা গেছে। কদম সবার অনুমতি নিয়ে জানায়, তার ছেলে কুদ্দুস ইট দিয়ে ছাগলের মাথায় মারেনি। ঝুনুর গরুরগাড়ির চাকায়........। কদম আলীর কথা শেষ হতে না হতেই ঝুনু বাঘের মতো ঝাপিয়ে ওঠে।
:খবরদার কদম ভাই, উল্টোপাল্টা কতা বুলবা না। মাইপেজুপে কতা কবা। ইডা ইয়ারকি মারার জাগা নাই।
ঝুনুর ধমকানি শুনে চুপসে যায় যায় কদম আলী। বাবার খুব কাছে বসে অসহায় কুদ্দুস থরথর করে কাঁপে। সে ভাবে এই কি বিচার? মনে মনে আল্লাহর কাছে বিচার সপে দেয় সে। কেউই আসল কথায় কান দেয় না। সবাই দোষ চাপায় কুদ্দুসের ওপর। মূল ঘটনা চাপা পড়ে যায়। কদম আলী গরিব বলে তার কথা কোনো কাজে আসে না। কয়েকজন অবশ্য কদম আলীর কথা শুনতে চায়। কিন্তু সাহস করে তারা কিছুই বলতে পারে না। যদি হিতে বিপরীত হয়। শেষমেশ নগদ সাত শ টাকা জরিমানা করা হয় কদম আলীকে।
গ্রামের প্রভাবশালী মণ্ডল ইছাহক আলী। তিনি মিটিঙের মাঝ থেকে ঠাণ্ডা গলায় কদম আলীর উদ্দেশে বলেন-
: ও কদম, ছেলে ছাগল য্যাকুন মাইরেচে, স্যাকুন জরিপানাতো দিবা? নাকামো মাইরো না, সোজা হয়ে ট্যাকাগুলো দিয়ে দ্যাও।
:মাইজ ভাই, তুমি বিশ্বাস করো, ছাগলডা নাকি ঝুনুর গাড়ির তলায় পড়ে মরেচে। আমার কুদ্দুস মারিনি। এট্টু দয়া করো মাইজ ভাই। কুদ্দুস এ্যারাম কাজ কত্তিই পারে না। সে মিত্যে.....
কদম আলীর কথা শেষ হতে না হতেই সালিসের মাঝখান থেকে চিল্লিয়ে ওঠেন আরেক মণ্ডল নুর ইসলাম। তিনি তেজি গলায় বলে ওঠেন
:নরম কাটচি বুলে আসপদ্দা পাইয়ে যাইচ্চো না। অরাম ম্যান ম্যান কোইরো না। সোজা হয়ে ট্যাকা বের করো। কোনো কতা শুনতি চাইনে। ভিন গিরামের লোকের ছাগল মাইরোচো। সোজা হয়ে ট্যাকা দিয়ে দ্যাও। আমাগের কতা গিরায্যি হচ্চে না বধায়
মণ্ডলদের গজরানি শুনে কদম আলীর বুক শুকিয়ে যায়। সব বুঝেসুঝে সমাজের প্রতি কেমন যেন একটা নেতিবাচক ধারণা জন্মে কুদ্দুসের। তার খুব ঘৃণা হয়। এ কেমন সমাজ। এ কী বিচার?
ভরা মজলিশেই টাকা পরিশোধ করতে হবে বলে কদম আলীকে বারবার শাসিয়ে দিচ্ছে মণ্ডলরা। কিন্তু কদম আলী অপারগ। সে প্রতিদিন ৪০ টাকায় মুনিস খেটে সংসার চালায়। এতো টাকা একবারে কীভাবে দেবে? সালিসে সে সময় প্রার্থনা করে।
:মাইজ ভাই, আমার কডা দিন সুমায় দ্যাও। ইর মদ্যিই ট্যাকা শোদ করে দেবো। বাড়ি দুটো খাসির বাইচ্চা আচে। সামনে বুদবারের হাটে তুইলবো। বেচলিই ট্যাকা হয়ে যাবেনে।
:আইচ্চা, থালি তুমি বুদবারের মদ্যি আমার হাতে ট্যাকাডা পুঁছি দিবা। না হলি কিন্তু বুজতিই পাইচ্চো কী হবে।
১৮.৬.২০১১ খ্রি. বনানীবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা।
সুন্দর ।।। আবহমান বাংলার যে নোংড়া অংশ এখনো বজায় আছে তা ফুটে উঠেছে ।
উত্তরমুছুন