এ্যাট্টা টাহা দিবেন চাচা, দুডি ডাল ভাত খামু। সক্কাল থ্যান কিছু খাই নাই। খিদায় প্যাটটা জ্বলতাছে। দ্যান না চাচা। আপনার লাইগা অনেক দোয়া করুম।
দূর হ বেজাতের বাচ্চা। ন্যাকামির জায়গা পাস না। কামাই করে খা গে, যা যা ভাগ। যতসব!
দোকানদার গ্যাদাকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। ওর কাকুতি মিনতির কোনো পাত্তা দেয় না দোকানি চাচা। উল্টো অজাত বেজাত বলে গালমন্দ আর গলা ধাক্কা খেয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে।
গ্যাদার বয়েস সাত বছর। চুয়াডাঙ্গার রেলবস্তিতে থাকতো ওরা। গত বোশেখে ওর মা মারা গেছে জণ্ডিসে। আর বাবা সে কোনো দিন দেখেনি। ওদের আদি বাড়ি কোথায় তা গ্যাদা জানে না। তবে মায়ের কাছে শুনেছে, ওদের অনেক জমিজমা ছিল। বন্যায় জমিজমা আর ঘরবাড়ি সব ডুবে যায়। নদীর ভাঙনে এক সময় বিলীন হয়ে যায় সব। তারপর তারা আশ্রয়হীন হয়ে চুয়াডাঙ্গায় চলে আসে। আশ্রয় নেয় রেল বস্তিতে। তবে সে সময় গ্যাদা ছিল কোলের শিশু।
গ্যাদা যখন খুব ছোট তখন ওর বাবা মারা যায়। মায়ের কাছে ও গল্প শুনেছে। বাবা তাকে খুব আদর করতো। বাজার থেকে নিয়ে আসতো চকলেট, বাদাম আর রঙ বেরঙের খেলনা। ওসব কথা শুনলে গ্যাদার বুক থেকে কেমন যেন একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে যায়। ইশ! বাবা থাকলে কী মজাই না হতো ওর। রঙিন রঙিন পোশাক পরে পাড়ার সাথীদের সাথে স্কুলে যেত সে। বারবার ভাবে গ্যাদা।
গ্যাদার মা মারা যাওয়ার পর ছ মাস হলো বস্তি ছেড়েছে ও। এ তল্লাটে ওকে আর কেউ চেনে না। তবু চেয়েচিন্তে কোনো রকম পেট চলে যায় তার। কিন্তু আজ তামাম শহর মেরেছে; এক আট আনা পয়সা ছাড়া কিছুই জোটেনি। পেটে এক ফোঁটা দানাপানি পড়েনি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। কী করবে ভেবে পায় না সে। বেলা গড়িয়ে প্রায় বিকেল। গ্যাদার পা আর ওঠে না। খিদের ঘোরে দুই পা যেন থেমে আসে। কিছু যে খেতেই হবে। বড্ড কষ্ট করে পা বাড়ায় সে। পৌঁছে যায় শহরের আরেক প্রান্তে। হঠাত মাংসের গন্ধ। থমকে দাঁড়ায় গ্যাদা। মুখ চুকিয়ে কয়েকটা ঢোক গিলে নেয় সে। বুঝতে পারে পাশের মিয়া বাড়িতে বিয়ের আয়োজন। লোভ সামলাতে পারে না। ওখানে গেলে মিয়ারা অবশ্যই গোশ ভাত দেবে। এবার সে পেট পুরে খাবে। তারপর নাক ডেকে ঘুমুবে স্টেশনে। এসব ভেবে চটপট পা ফেলে। ওর মন খুশিতে চনমন করে ওঠে। মিয়া বাড়ির গেটের দিকে পা বাড়ায় সে। টান পায়ে ঢুকে পড়ে বাড়ির ভেতরে।
গ্যাদার পরনে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট। নগ্ন ও রোগা শরীর। সে ধীরে ধীরে চলে যায় আত্মীয়দের মজলিশের কাছে। হঠাত চোখে পড়ে ছোট মিয়ার। গ্যাদাকে দেখেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। বাজখাই গলায় চিল্লিয়ে ওঠেন। বাড়ির দারোয়ানকে ডাকেন তিনি ‘এই হারামজাদা কালু, এসব উদোম পশুটশু বাড়িতে ঢোকে কীভাবে রে। শিগগির বের করে দে।’
পড়িমরি ছুটে আসে দারোয়ান কালু। অবস্থা বেগতিক বুঝে গ্যাদা কিছু বলতে যায়। তার আগেই কালু ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় কষে দেয় মাসুম গ্যাদার তুলতুলে গালে। গ্যাদার পুরো পৃথিবীটা যেন ওলোট পালোট হয়ে যায়। ভিমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে যায় সে। তাতেও রক্ষে হয় না তার। টেনে হেঁচড়ে তাকে বের করে দেয় সদর গেটের বাইরে। গ্যাদার মাথা বনবন করে ঘুরপাক খায়। খানিকটা বসে সে নিজেকে সামলে নেয়। একটা পথের ক্ষুধার্ত টোকাইকে এভাবে নির্যাতন করতে একটুও বাধে না ছোট মিয়ার।
গ্যাদার ওপর বাহাদুরি খাটিয়ে বীরের মতো মিয়া বাড়িতে ঢোকে কালু। নির্যাতনের এ দৃশ্য একজন অতিথি দেখে খুবই বিস্মিত হলেন। তিনি কালুর উদ্দেশে বললেন অতোটুকু একটা শিশুকে ওভাবে মারতে আছে! কথাটা ছোট মিয়ার কানে যায়। তিনি একগাল হেসে ওঠেন, না না ভাই ওদের গায়ে লাগে না। ওরা জন্মের পর থেকেই মার খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন