শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৬

হেঁটে শত মাইল



ছেলেবেলায় একবার রাগ করে বাড়ি ছেড়েছিলাম। পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলাম শত মাইল। পদ্মা নদীও পার হয়েছিলাম হেঁটে। সে কী তখলিফ। দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে লেজে গোবরে দশা। ঈদের নতুন জামা না পেয়ে এই কা- আমার। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আমি। গরিব বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম নতুন জামার। মাকেও আবদারটা জানিয়ে আসছিলাম দিন বিশেক ধরে। কিন্তু কোনো কিছুতেই মন গললো না তাদের। বন্ধুরা সবাই ঈদের নতুন জামা-কাপড়ের গল্প করে। আর আমার হবে না? খুব মন খারাপ হলো। জিদ চেপে বসে মাথায়। জামা না পেলে বাড়িতে ঈদ করব না। একটা কিছু করে বসব। চট করে মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। না, বাড়িতে আর থাকব না। দুচোখ যেদিকে যায় চলে যাব। কোনোদিন ফিরব না।
দুদিন পরেই কোরবানির ঈদ। ছোট্ট একটা পলিথিনের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তাতে একটা পুরোনো শার্ট, আর একটা লুঙ্গি। কোথায় যাব নিজেও জানি না। পরের বাড়িতে রাখালি করে খাব তবু বাড়ি ফিরে আসব না। যে পণ সেই কাজ।
সকাল ১০টার দিকে চুয়াডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ থেকে রেললাইন ধরে হাঁটা শুরু করলাম। মাঝে মাঝে কাঁদছি। নিজের ওপর খুব ঘেন্না হচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। আর পা চলে না। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত। পকেটে একটা কানাকড়ি নেই। দিনভর পেটে দানাপানি পড়েনি। হালসা ছাড়িয়ে পোড়াদহ স্টেশনে পৌঁছুলাম। একটু পরেই সন্ধ্যার আজান পড়ল। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় একেবারে নেতিয়ে পড়েছি। স্টেশনেই একটি চা-স্টল। পাউরুটি আর কলা ঝুলছে দোকানে। খাইখাই করে তাকিয়ে আছি। কোনো উপায় নেই। পলিথিনে মোড়ানো লুঙ্গিই আমার একমাত্র পুঁজি। নিরুপায় হয়ে দোকানদারকে বললাম চাচা লুঙ্গিটা নিয়ে আমাকে কিছু খেতে দেবেন। মুরব্বি লোকটা আমাকে খেদিয়ে না দিয়ে কাছে ডেকে সব শুনলেন। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়, এমনিতেই হোটেলে নিয়ে তিনি পেট পুরে আমাকে খেতে দিলেন। আর বুঝিয়ে বললেন, রাগ ভুলে মা-বাপের কাছে ফিরে যাও। কিন্তু আমি চাচার কথায় রাজি হলাম না। লুঙ্গিটা বিছিয়ে রাতটুকু স্টেশনেই কাটিয়ে দিলাম। ট্রেনে উঠতে খুব ভয় পাচ্ছি। বিনা টিকিটে উঠলে যদি চেকারে ধরে। সূর্য ওঠার আগেই ফের হাঁটা শুরু। এবার কোথায় গিয়ে আমার চলার শেষ হবে তা আল্লাহ মালুম। মিরপুর, ভেড়ামারা পেরিয়ে একবারে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর। ব্রিজের পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ। ওই পথ দিয়ে হেঁটে ঈশ্বরদী ছাড়িয়ে কত নাম না জানা স্টেশন পেরিয়ে ছুটে চলেছি। আমি কাহিল। সন্ধ্যা ঘোর ঘোর। রেললাইনের পার্শ্ববর্তী মেঠো পথ ধরে উঠলাম একটি ছায়াঢাকা গ্রামে। সেখানে এক দর্জির বাড়িতে আমার আশ্রয় হলো। রাজশাহীর বাঘা উপজেলা। গ্রামের নাম ঝিনা। সেই বাড়ির একপাল ভেড়া চরানোর কাজ জুটলো আমার। দিন যেতে না যেতেই গৃহকর্তা গাজি সাহেব আমাকে ছোট ভাইয়ের স্নেহে জড়িয়ে নিলেন। দিন দশেক পরে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে তিনি ট্রেনযোগে আমাকে বাড়িতে রেখে গেলেন।
০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬
# # # # # # # #

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন