বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১১

হ্যামিলনের বাঁশিআলা

এক্কেবারেই সত্যি কথা

মন দিয়ে তা শোনো,

এর মাঝে নেই নকল-ভেজাল

গলদ কিছু কোনো


আদ্যিকালে হ্যামিলনের

ছোট্ট শহর জার্মানে,

কেউ কি জানো সব মানুষই

কাদের কাছে হার মানে?


সে বাপু এক বিরাট ব্যাপার

সে কী আজব কারখানা,

লাখে ইঁদুর ঝাঁকে ইঁদুর

নয় দুটো বা চার খানা


ইঁদুর থাকে লেপ তোষকে

আলমারি খাট-বিছানায়,

তাদের ভয়ে পালায় মানুষ

তিল পরিমাণ মিছা নাই


পাঁচ ছ কেজি করে করে

এক ইঁদুরের ওজন,

ইঁদুরেরা বিড়াল ধরে

মাংস করে ভোজন


গুরুতর ব্যাপার দেখে                                                  

বিড়াল-কুকুর পালায়,

মানুষে দেয় গলায় দড়ি

এই ইঁদুরের জ্বালায়


ছেলেপিলে জড়োসড়ো

ইঁদুর দেখে ডরায়,

ছন্নছাড়া জীবন যেন

গজব নামে ধরায়


ভাত রুটি খায় তরকারি চাল

মুড়কি চিড়ে খই,

কাগজ খাতা খেলনাপাতি

কিতাব কলম বই-


কাঁথা বালিশ চেয়ার টেবিল

কাপড়চোপড় আলনা

বাকশো শোকেচ ঘরের মেঝে

দরোজা গেট জালনা-


কেটেকুটে নাস্তানাবুদ

সে কী করুণ দশা,

খেতে গেলেও থালের ওপর

আস্ত ইঁদুর বসা!


লাখ কিছিমের ইঁদুর ছোটে

লাখ কিছিমের জাত,

সব সেয়ানা আস্ত বেজুত

সবকটা বজ্জাত


দামড়া ইঁদুর ধেড়ে ইঁদুর                                                      

পিচ্চি গদাই বেঁড়ে ইঁদুর

নেংটি ইঁদুর ধাড়ি ইঁদুর

গোঁফঅলা ও দাড়ি ইঁদুর


নাদান কুঁড়ে লেজি ইঁদুর

দাঁতলা মোটা বেঁজি ইঁদুর

পেটুক ইঁদুর বুড়ো ইঁদুর

তাগড়া জোয়ান খুঁড়ো ইঁদুর


বড় ইঁদুর বাচ্চা ইঁদুর

কেজি ছটাক কাচ্চা ইঁদুর

গর্ত ইঁদুর গেছো ইঁদুর

পুঁটকে ধাঙড় মেছো ইঁদুর


লম্বা ইঁদুর খাটো ইঁদুর

ছ্যাবলা ছুঁচো ডাঁটো ইঁদুর

শলা ইঁদুর বেঁটে ইঁদুর

ঝেড়ো ইঁদুর মেটে ইঁদুর


কালো ইঁদুর শাদা ইঁদুর

নানা নাতিন দাদা ইঁদুর

বুড়ি ইঁদুর গুঁড়ি ইঁদুর

ধুমড়ি তাজা ভুড়ি ইঁদুর


ছোকরা ইঁদুর পাঠা ইঁদুর

ল্যাংড়া ও লেজকাটা ইঁদুর

খাদক পাজি খোঁড়া ইঁদুর

একড়ো এবং জোড়া ইঁদুর


হরেক রকম ইঁদুরমিলে                                                       

করে মাতামাতি,

লোকের মাথায় উঠে নাচে

দ্যাখো কী বজ্জাতি!


না দেখে তা যায় না বলা

অত্যাচারের ধরন,

বেঁচে থাকার চাইতে লোকের

অনেক ভালো মরণ


সেই ইঁদুরের গেরো-ফাঁদে

পড়ে মানুষ সবাই কাঁদে

ভয়ে যবুথবু,

লাঠি ঠ্যাঙা মেরে ইঁদুর

ঘর ছাড়ে না তবু


রাত দুপুরে যুদ্ধ বাধায়

অনেক ইঁদুর মিলে,

হাঁস মুরগি ছাগল ছানা

হজম করে গিলে!


ইঁদুররা কি মানুষ খাবে

পড়লো সবাই চিন্তায়,

ভয়ের ঠেলায় গা ঘেমে যায়

কাটে না আর দিন তাই


কেউ লুকিয়ে লেপ মুড়ি দেয়

কেউ পালিয়ে গাছে,

তাবত মানুষ জিম্মি হলো

সেই ইঁদুরের কাছে


কেউ মারা যায় ভয়ে ভয়ে                                    

কামড় খেয়ে কেউ,

ওষুধপালা তাবিজ-কবচ

হচ্ছে না তাতেও


ইঁদুর হাজার শত শত

হাতে মেরে কমে কতো

যায় ছড়িয়ে রোগ,

সবার দাবি বন্ধ করো

এই মহা দুর্ভোগ


টেনশনে যায় কপাল ঘেমে

ভাবেন সিটি মেয়র,

হাজার রকম দোষের বোঝা

চাপায় ঘাড়ে এ ওর!


মানুষজনের বাঁচার আশা

হলো প্রায় শেষ,

হঠাৎ করে পৌরপিতার

হয় জারি নির্দেশ


সামনে মাসের দশ তারিখে

মিটিং হবে বড়,

মাথাধরা লোকগুলোকে

করতে হবে জড়ো


এলান শুনে মানুষ আসে

পৌরসভা ভরা

গরম গরম ভাষণ চলে

এখন কী যায় করা?


বক্তারা সব গলা ফাটায়                                            

কী সমাধান আছে,

হাজার দশেক ইঁদুর ঘোরে

সেই মিটিঙের কাছে


লজ্জাতে সব নীল হয়ে যায়

মাথা করে হেট,

একটা মানুষ হঠাৎ খোলে

পৌরসভার গেট


মাপে হবে লম্বা ছ হাত

লোকটা খুবই লিকলিকে,

ভাবলো সবাই অচেনা লোক

ছেলেধরা ঠিক ঠিক এ!


মাথায় বেঢপ লম্বা টুপি

পোশাকও আলখাল্লা যে,

খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখে

কী করে সে আল্লাহ যে!


কিম্ভুতকিমাকার লোকখানা ঢুকলো

মেয়রকে লম্বায় সেলামটা ঠুকলো

মেয়র তো তাজ্জব এ আবার কে!

খানিকটা দেখে নেন চোখ পাকিয়ে


মেয়র বলেন- চাই কী তোমার

জলদি বলো তা যে,

ব্যস্ত আছি ইঁদুর নিয়ে

আলোচনার কাজে


বাঁচার আশায় করছি মিটিং                                       

আশা খুবই কম,

কপাল দোষে ঘরের ইঁদুর

আজ আমাদের যম


যাগগে এ সব; তোমার কথা

এবার বলো খুলে,

ভিনদেশি লোক বুক ফুলিয়ে

বললো মাথা তুলে-


দশ মিনিটেই তাড়িয়ে দেবো

দেশের ইঁদুরগুলো,

ফর্সা হবে ঘরবাড়ি মাঠ

রান্নাঘর ও চুলো


এক ইঁদুরও থাকবে না আর

ওষুধ করার জন্যে,

শহর জুড়ে বইয়ে দেবো

হাসি-খুশির বন্যে


ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাবেন মেয়র

আজগুবি সব সাহস যে ওর!


মেয়র বলেন- কেমন করে

ইঁদুরগুলো তাড়াবে?

মিথ্যে যেন হয় না কিছু

বুঝ-শুনে পা বাড়াবে


লোকটা বলে ইঁদুর তাড়াই                                          

আমার বাঁশি বাজিয়ে,

হাজার সোনার মোহর দিলে

দেখতে পাবেন আজই এ


থাপড়ে টেবিল বলেন মেয়র

এক কেন বিশ হাজার,

যা চাও দেবো বাজাও বাঁশি

নেইতো সময় আজ আর


বললো সে লোক- দেখুন মেয়র

কথার যেন ঠিক থাকে;

বজায় চতুর্দিক থাকে


মেয়র বলেন- আমার কথায়

নেই তো কোনো ঘের,

দিব্যি দোহাই পয়সাকড়ির

হবে না হেরফের


মিটিং ভেঙে সবাই দেখে

বাঁশিঅলার মুখ,

চারদিকে তার ভিড় জমে যায়

দেশবাসী উৎসুক


বাঁশিঅলা সেলাম দিয়ে

পড়লো নেমে রাস্তায়,

শহরবাসী প্রথম দিকে

পাচ্ছিলো না আস্থাই


ভিনদেশি লোক ঝোলা থেকে                               

একটা বাঁশি তুললো,

করুণ করুণ চাহনি তার

মেজাজটা উৎফুল্ল।


বাঁশিটা তার চিকন সরু

সাপের মতোন বাঁকা,

ফু দিলো যেই সুর বেরুলো

মিষ্টি ঝাকানাকা


বাজছে বাঁশি উঠছে সুর

এদিক ওদিক ছুটছে সুর


হঠাৎ লোকের বাড়ি থেকে

বাকশো টুপি গাড়ি থেকে


ঘটি থেকে বাটি থেকে

গর্ত পুকুর মাটি থেকে


কলসি থেকে ঝুড়ি থেকে

খই চানাচুর মুড়ি থেকে


খড়বিচালির পালা থেকে

বদনা বাসন থালা থেকে


আলমারি লেপ কাঁথা থেকে

গেঞ্জি জামার হাতা থেকে


গামলা হাড়ি কুলো থেকে                                      

রান্নাঘরের চুলো থেকে

ছুটলো ইঁদুর বেরিয়ে;

বুঝলো সবাই বাঁশিঅলার

সাচ্চা কথা ঢেরই এ


ইঁদুর ইঁদুর খালি ইঁদুর

হন্যে হয়ে উঠলো,

বাঁশিঅলার পেছন পেছন

পড়িমরি ছুটলো


রাস্তা দোকান ঘাটের মানুষ

শহর বাজার হাটের মানুষ

অফিসপাড়া বাড়ির মানুষ

রিকশা মোটর গাড়ির মানুষ


বিলকুল সব থ হয়ে যায়

বিস্ময়ে রয় তাকিয়ে,

ভাবছে সবাই বাঁশিঅলা

করছে জাদু না কী এ?


বাঁশিঅলা সুর হাঁকিয়ে

চললো দূরে এগিয়ে,

শহর ছেড়ে নদীর কূলে

থমকে দাঁড়ায় সে গিয়ে


তারপরে ঠিক বাজলো কানে

টুপটাপ,

ইঁদুরগুলো পড়লো জলে

ঝুপঝাপ-

দশ মিনিটেই শান্ত নীরব

চুপচাপ


যতো ইঁদুর তলায় গেল                                       

অথৈ নদীর ঢেউয়ের,

কেমন করে কী হলো তা

খোঁজ জানে না কেউ এর


কোটি কোটি ইঁদুর মরে

দশ মিনিটেই সাফ,

নগরবাসী স্বস্তি পেলো

বাঁচলো ছেড়ে হাঁপ


শহরজুড়ে নামলো খুশি

ফিরলো মুখে গান,

কেটে গেলো ষাট বছরের

পুরোনো টেনশান


বাঁশিঅলার ফুরফুরে চুল

উড়লো বাতাস লেগে,

পৌরসভায় ঢুকলো সে লোক

গিয়ে ঝড়ের বেগে


দু হাত তুলে সেলাম ঠুকে

ঠিক মেয়রের সামনেই

কয় দাঁড়িয়ে- মেয়র বাবু

আমারতো আর কাম নেই

হাতের বাঁশি আস্তে করে

লম্বা ঝোলাই ঢুকিয়ে,

বললো সে লোক এবার আমার

পাওনাটা দিন চুকিয়ে


হৃদয়খোলা হাসির বাহার                                    

মিষ্টি মুখে ছিটিয়ে-

মেয়র বলেন- ব্যস্ত কেন

বোসো বোসো ন্যস্ত কেন

অবশ্যই এনাম দেবো

ঢোলক-সানাই পিটিয়ে


উঁচু করে ঘাড়,

বাঁশিঅলা বললো- মিছে

এনাম পুরস্কার


আমার কেবল পাওনাটা চাই

চাইনে কিছু বেশি,

কথায় কাজে মিল রাখি তাই

মানুষটা ভিনদেশি


মেয়র বলেন- কতো দেবো

সঠিক বলো এবার,

শান্ত গলায় বাঁশিঅলা

দেয় জানিয়ে সেবার


একটা হাজার সোনার মোহর

আমার পুরোই চাই,

এটাই কথা প্রথম কি বা

চূড়ান্ত একটাই


মেয়র বলেন- মোহর কি আর                                    

ইটের ভাঙা খোয়া,

নাকি তোমার ঘরে পোষা

ছেলের হাতের মোয়া?


চেলেই মেলে মোহর কি আর

মাঠের গুঁড়ো ঢেলা,

সোনার মোহর কামাই করা

অনেক লাগে ঠেলা


খুব বড় জোর পঞ্চাশটা

মোহর পেতে পারো,

খুশি হয়ে সাথে দুটো

এনাম দেবো আরো


হাজার টাকা সারা বছর

হয় না আমার মাইনে,

কয় মিনিটেই চাচ্ছো অতো

হয় কি এটা আইনে?


লোকটা বলে- হাজার মোহর

পুরোই হবে দিতে,

কম-বেশি তার বুঝিনেকো

চাইনেও তা নিতে


মেয়র বলেন- কথা ভেবো

পঞ্চাশটাই মোহর দেবো

নইলে পড়ো কেটে,

কথায় যেন বাঁশিঅলার

মগজ গেলো ফেটে


পড়লো মাথায় বাজ;                                           

করবে কী সে এক মিনিটেই

নেয় করে আন্দাজ


পৌরপিতার কথায় হলো

বাঁশিঅলার ক্রোধ,

ভাবলো নেবো আজকে আমি

উচিত প্রতিশোধ


বললো সে লোক, মেয়র বাবু

আপনি শুনে রাখুন,

ভিনদেশি তাই যাচ্ছি চলে

পারলে সুখে থাকুন


একটি কথা যাচ্ছি বলে

যতোই ভাবেন যা তা,

এর পরিণাম চার দেয়ালে

ভাঙতে হবে মাথা


পৌর মেয়র কাটতি কবুল

দেন না হাজার টাকা,

বাঁশিঅলা কষ্ট পেয়ে

ঘাড় করে দেয় বাঁকা


নিচে নেমে আবার ঝোলায়

ঢোকালো সে হাত,

বের করলো আরেক বাঁশি

বাধাতে সংঘাত


রোডে নেমে বাঁশিঅলা

বাঁশিতে সুর তুললো,

সুর যেন নয় ভেল্কি ম্যাজিক

জাদুর সমতুল্য


পাগলপারা স্বর্গীয় সুর

ছুটলো ঘরের কোণে,

উতলা সুর ঢুকলো গিয়ে

খোকা-খুকুর মনে


ছন্নছাড়া সুরের বাঁশি

বাজলো করুণ সুরে,

সুর চলে যায় হাওয়ায় ভেসে

অনেক অনেক দূরে


সুরের জাদু দেয় জাগিয়ে

শহর নগর-পাড়া,

হাজার হাজার খোকা-খুকু

হলো যে ঘর ছাড়া


এদিক ওদিক থেকে এলো

ছেলে-মেয়ের দল,

মিষ্টি চপল শান্ত সবুজ

হাবা ও চঞ্চল


শিশুরা সব ছুটে আসে

সুরের সে কী টান,

আরো আসে পৌর পিতার

দুই শিশু সন্তান



হাজার হাজার কচি-কাঁচা                                        

চললো সবাই লাফিয়ে,

পাল্লা দিয়ে ছুটতে গিয়ে

অনেকে যায় হাঁপিয়ে


বাঁশিঅলার পেছন পেছন

ছুটছে তারা ছুটছে,

কোনোপানেই মন নেই আর

সুরের জাদু লুটছে


বাঁশিঅলার তামাশা এ

ভাবলো নগরবাসী,

কেউ জানে না খোকা-খুকুর

হারিয়ে যাবে হাসি


বুঝলো না কেউ যাচ্ছে কোথায়

শুধু ছোটার বহর,

যখন বেলা ডুবুডুবু

ছাড়িয়ে গেলো শহর


বাজিয়ে বাঁশি সাগর জলে

করলো শুরু যাওয়া,

সেই খোকা আর সেই খুকুদের

আর গেলো না পাওয়া

১৯.৯.১৯৯০ খ্রি. কৃষ্ণপুর, চুয়াডাঙ্গা।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন