শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১১

পাখপাখালির দেশ

টুনটুনিরা বেজায় খুশি বসে ডালিম গাছে
দোয়েল পাখি লেজ নাড়িয়ে শিমের মাচায় নাচে
ফটিকজলের গান শোনা যায় গাছের পাতার ফাঁকে
সাতসকালে মিষ্টি সুরে চড়ুই পাখি ডাকে

সহেলিরা গভীর বনে রঙিন ডানা মেলে-
বাবুনাইয়ের সঙ্গে বেড়ায় মজার খেলা খেলে
কালো দোয়েল ঝিঙের বানে খেলে লুকোচুরি
পাতায় পাতায় নেচে বেড়ায় আলগোছে ফুলঝুরি

বুনো ফুলের সুবাস লেগে মাঠ করে মৌ মৌ
সরষে ক্ষেতের আ'লে নাচে হলদে বেনেবউ
দেবদারুটার ডালে বসে শ্যামা বাজায় শিস
লেজনাচুনের হরিণ হরিণ মায়াবি চোখ ইস!

মৌটুসিরা এদিক ওদিক নাচে সকাল-সাঁজ
জোয়ার-ভাটার খেলায় মাতে কিশোরী দুধরাজ
দুধরাণীদের দিন কেটে যায় সুখের নিশি আসে
বামনশালিক বাচ্চা ফোটায় আনন্দ উল্লাসে

ভাত শালিকের নাচানাচি ধান শালিকের সাথে
ঝুঁটি শালিক হেঁটে বেড়ায় বেশ মজা পায় তাতে
শরৎকালে লালমুনিয়া যায় নিয়ে কাশফুল
পিয়াল বনে পুচ্ছ নাচায় সিপাহি বুলবুল

মধুবাজের সাঁ সাঁ চলা বাতাস ওঠে দুলি
কাঁঠাল বনে গান গেয়ে যায় নিজ সুরে বুলবুলি
সবুজ মাঠের সোনালি ঢেউ ফুটফুটি যায় ছুঁয়ে-
বাসা বানায় মিহি ঘাসের চিকন ডানা ধুয়ে

নীলটুনিরা ঠোঁট লাগিয়ে ফুলের মধু খায়
বাসায় ফেরে আপন মনে গোধূলি সন্ধ্যায়
আকাশ থেকে নিরীখ করে সেয়ানা চিল-বাজ
দুষ্টুমিতে পাকা খুবই সাহসী কেশরাজ

উলুঘাসের ঘন বনে ভরত পাখির বাসা
কমলা বউয়ের পটোলচেরা দু চোখ ভাসা ভাসা
পাকা-রাঙা ঝালের ক্ষেতে নাচে টিয়ের মন
হলদে ফিতে মাথায় নাচে বালিকা খঞ্জন

শীতের দিনে রামগাঙরা পাখায় কাটে বিলি
জলময়ূরে সাঁতার কাটে রোদের ঝিলিমিলি
বনবাগানের ঠাসবুনুনি সেথায় বকের মেলা
বিলের জলে পানকৌড়ির ডুব-সাঁতারের খেলা

কুড়াবাজের বড়শি থাবায় শিকার ওঠে গেঁথে
গাঙচিলেরা আহার করে উড়াল যেতে যেতে
পদ্মফুলের থালাপাতায় জলপিপিরা হাঁটে
রঙিলা বক উঁকি মারে রাইসাবিলের ঘাটে

জল-লাগোয়া ঝোপের ভেতর ডাহুক পাড়ে ডিম
নদীর ধারে মাছরাঙারা সময় কাটায় হিম
নদীনালা খালের পাড়ে মাছরাঙাদের বাস
জল-শেঁওলার কোলে কোলে সাঁতার কাটে হাঁস

সাপ পাখিদের সাপের মতন লম্বা সরু গলা
কলমিদামের ওপর বসে খায় বসে মাছ মলা
হালতি কালিম চখাচখী দিঘর এলো শীতে
ডুবুরি ও মুরহেন পাখি মাতালো সঙ্গীতে

এক পায়ে রয় ঠাঁই দাঁড়িয়ে ঠোঁট যেন তার সুচ
দৌড়ে সবার আগে ছোটে চঞ্চলা কালকুঁচ
কুসুম ভোরে পুব আকাশে সূর্য ওঠে রাঙা
উড়াল দিয়ে বিলে ছোটে সারস শামুকভাঙা

সাগর ঈগল পলাশ ঈগল শঙ্খচিলের মেয়ে
একনাগাড়ে ঘুরে বেড়ায় সাগর পানে যেয়ে
বিলের জলে নামে এসে বালিহাঁসের ঝাঁক
গরান বনের মাথায় বসে ভাবে মদনটাক

সুন্দরী হাঁস সরালী হাঁস রাজহংসী আর-
মাছমুরাল ও কানিবকে কাজ করে যে যার
খোপা ঈগল আকাশ পানে একটানা যায় উড়ে
ভুবন চিলের ছেলেপুলে থাকে আকাশ জুড়ে

নলখাগড়া জলকলমি আর হেঁতালের বনে-
সারাটা দিন ঘুমায় বসে গাঙশালিকের কনে
নিশিবকের ছানা ওঠে রাতবিরেতে কেঁদে
রঙিন রাঙা ধূসর কসাই বেড়ায় গলা সেধে

হোগলা বনের ঝোপের ভেতর ঘুরছে জোড়া জোড়া
জলমুরগি রেইল ঢেঙা জিরিয়া ও কোড়া
পুরুষ কোড়ার মাঝকপালে টুকটুকে রঙ লাল
রাঙা আঙুল রাঙা দু চোখ পান্না সবুজ গাল

ঘর-গোয়ালের ধারে ধারে হাঁড়িচাচা ঘোরে
খিদের জ্বালায় পাতিকাকের ঘুম আসে না ভোরে
বাবলা বনে বুনো ঘুঘু খুঁজে বেড়ায় সাথি
তিলা ঘুঘু ছিট ঘুঘুদের বেজায় মাতামাতি

সবুজ-লাল ও মটরঘুঘু মগডালে দেয় ঘুম
বনমোরগে সময় কাটায় বেতবনে নিজঝুম
ভাদর মাসে তালের বনে কার যেন গান শুনি
ঝিট ঝিট ঝিট ছন্দ তোলে সুরেলা ধানটুনি

ভ্যাদা টুনি গানের সুরে পাঠায় মেলা চিঠি
চেঁচায় খালি গোবরে শালিক কসাই ও হট্টিটি
মোচাটুনি বাসা বানায় কলাপাতার নিচে
ছাতারে বেশ ঘুরে বেড়ায় ঘাসফড়িঙের পিছে

চশমা পাখির চশমা চোখে, কাঠঠোকরা কাঁদে
জলডাকাতের হেড়ে গলা তাই সাধে আল্লাদে
জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝিমদুপুরে রোদ পড়ে খুব ঠা ঠা
নাড়ার বনে ফড়িং ধরে অনেক ধুলোচাটা

তেতুল গাছের উঁচু ডালে লক্ষ্মীপেঁচা বসে
গভীররাতে ভয় দেখাতে হাঁক ছাড়ে বেশ কষে
শিশু বাগান মাতায় সে কী হরিয়ালের দল
বনকবুতর খিদে পেলে যায় হয়ে চঞ্চল

বাবুই পাখি তালের পাতায় নিপুণ বাসা বোনে
চামচিকেরা সারাটাদিন ঘুমায় ঘরের কোণে
গোধূলি রঙ পাখায় মাখে সুইচোরাদের ছানা
বাঁশবাগানের তলায় বসে ঘুমায় দিনেকানা

মিষ্টি সুরে কোকিল ডাকে রঙিন ফাগুন কালে
ফিঙেরাজা নেচে বেড়ায় নিমের ডালে ডালে
কৃষ্ণচূড়ার ফুলে ফুলে পাপিয়া গায় গান
মোহনচূড়ার শিঙের চুলে হাওয়ায় তোলে তান

বনকোয়েলের গলায় ওঠে নতুন সুরের ধারা
ঝুঁটি ভরত তালে তালে নেচেই দিশেহারা
হাজার পাখি হাজার সুরে গাইতে পারে বেশ,
আমার সোনার বাংলা যে তাই পাখপাখালির দেশ।
১৮.৮.০৭ খ্রি. বনানীবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন