![]() |
| খাগড়াছড়ির আলুটিলা পাহাড়ের ওপর অন্যদের সাথে আমি আহাদ আলী মোল্লা ও কাজল মাহমুদ |
চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের ভ্রমণপিয়াসী একদল সাহিত্যকর্মী উদ্যোগ নিলেন ভ্রমণে বের হবেন। ভ্রমণের স্থান খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার। সপ্তাহখানেকের এ ট্যুরের সহযাত্রী হলাম আমরা ১৩ জন। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় মাইক্রোবাসযোগে যাত্রা শুরু হলো চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের আঙিনা থেকে। পরিষদের একনিষ্ঠ বন্ধু চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দারের সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করা হলো তার পৌরসভায়। তিনি হাসিমুখে অভিনন্দিত করলেন। জানালেন কোনো প্রকার সমস্যা মনে করলে সাথে সাথে তাকে জানাতে। সাহস বেড়ে গেল কয়েক গুণ। তার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাইক্রোযোগে গেলাম কুষ্টিয়া। সেখান থেকে হানিফ পরিবহনে চট্টগ্রামে রওনা দিলাম সন্ধ্যা ৭টায়। সারারাত চললো হানিফ পরিবহন।
আমাদের ১৩ জনের ভ্রমণকারী দলে ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম, সহসভাপতি আবুল কাশেম, সাইফুল ইসলাম পিনু, জেড আলম, গোলাম কবীর মুকুল, রিচার্ড রহমান, কাজল মাহমুদ, আদিল হোসেন, যাহীদ জীবন, আমার ভায়রা সাংবাদিক হোসেন জাকির এবং আমি নিজে। তবে আমাদের আরেক বন্ধু চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক মুন্সি আবু সাইফের জন্যে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের সাথেই ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল তার; কিন্তু হঠাৎ করে শরীরটা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি আমাদের সাথে যোগ দিতে পারলেন না।
শান্তি পরিবহন যখন চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক দিয়ে খাগড়াছড়ির দিকে ছুটে চলেছে তখন আমরা খেয়াল করছিলাম, সেখানকার পরিবেশ, গ্রাম, রাস্তাঘাট, বাজার, মাঠ, গাছগাছালি ইত্যাদি। সবকিছুই যেন অন্যরকম। চুয়াডাঙ্গার পরিবেশ আর চট্টগ্রামের পরিবেশের সব কিছুই এক্কেবারে আলাদা রকমের। হাটহাজারী উপজেলায় হাটের ছড়াছড়ি। রাস্তার দু ধারের সাইনবোর্ডগুলো থেকে আমাদের কারোরই চোখ সরে না। তখনকার বিষয় হাট। মৌরিহাট, সরকারহাট, কাটিরহাট, মদনহাট, নুর আলী মিয়ারহাট, নাজিরহাট, বহদ্দার হাট, বারৈয়ার হাট, বিবিরহাট, মাঝিরহাটসহ অসংখ্য নামের শেষে হাট। কোনো বাজারের শেষে হাট দেখলেই সফরসঙ্গীরা চিল্লিয়ে জানাচ্ছিলেন, মোল্লা তুমি হাটের নামগুলো নোট করো। এতোসব হাটের নাম মনে থাকবে না বলেই লিখে রাখার তাগিদ। তবে যতক্ষণে পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে নোট করা শুরু করেছি, ততক্ষণে অনেক হাটের নামই চোখের অন্তরালে ঢাকা পড়ে গেছে। ঘণ্টাখানেক ধরে প্রায় সমতল ভূমি দিয়েই চলছিলো আমাদের শান্তি পরিবহন। বেলা ঠিক ১১টা। নয়াবাজার আর্মি ক্যাম্প ছাড়াতেই শুরু হলো খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। রাস্তার দু ধারে তাকিয়ে দেখি পাহাড় আর পাহাড়। গাছগাছালিতে ঘেরা পাহাড়। বেশি দূরে চোখ যায় না। সবুজ অরণ্যে আটকে যায় দৃষ্টি। কখনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠছি আবার কখনো নামছি এভাবেই বাস এগিয়ে চললো। মাঝে মাঝে দেখা গেল পাহাড়ে পাহাড়ে উপজাতিদের আবাস। ছোট ছোট ঘর। এখানে একটা বিষয় মনে পড়ে গেল। আমরা চট্টগ্রাম থেকে যে শান্তি পরিবহনে চড়ে খাগড়াছড়ি যাত্রা শুরু করলাম। সেই বাসেই ছিলো বেশ কয়েকজন উপজাতি নারী-পুরুষ। তাদের সাথে ছিল উপজাতি শিশুরাও। খেয়াল করে দেখলাম তাদের চেহারা যেমন বাঙালিদের সাথে মেলে না। তেমনি তাদের ভাষাও আলাদা। তারা আমাদের সাথে বাংলায় কথা বললেও তারা তাদের সাথে কথা বলার সময় নিজের ভাষায় কথা বলছে। ফলে আমরা এক্কেবারে হা। তাদের কোনো কথাই বুঝতে পারছিলাম না।
ঘটির কাঁটায় বেলা ১২টা ছুঁই ছুঁই। বাস থামলো। চা বিরতি। দেখলাম ছোট্ট একটি বাজার। দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলায় লেখা মানিকছড়ি বাজার। ১০ মিনিট বিরতির পর আবার ছুটে চললো বাস। যত যাচ্ছি ততই যেন পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আটকা পড়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে উঁচু পাহাড়ের ওপর আর্মি ক্যাম্প। ক্যাম্পের প্রহরীরা অস্ত্র তাক করে বসে আছে। সে এক অন্য রকম পরিবেশ। অন্য রকম অনুভূতি। ধীরে ধীরে বিশাল ও বিরাট বিরাট উঁচু পাহাড়ে উঠতে লাগলো আমাদের বাস। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘেঁষে তৈরি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। বিরাটকায় এক পাহাড়ের ওপরে যখন বাস; তখন চোখে পড়লো অনেক দূরের সীমানা। বড় বড় বাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো খেলনাবাড়ি। বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। এখন যদি বাস কোনো রকম ব্রেক বা গিয়ার ফেল করে তাহলে আমরা এক্কেবারে আলুভত্তা হয়ে যাব। বেলা যখন আড়াইটা। ঠিক তখনই আমাদের বাসটি খাগড়াছড়ি জেলা শহরে গিয়ে পৌঁছুলো। কিছুক্ষণ পরই আমাদের আতিথেয়তা জানাতে ছুটে এলেন কবি উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি খাগড়াছড়ির একজন ভিকেল কর্মকর্তা হলেও তার আন্তরিক আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ হলাম। তিনি মাইক্রোবাসযোগে নিয়ে গেলেন একটি আবাসিক হোটেলে। সেখানে গোসল সারা হলো । আমাদের মধ্যে খাইখাই ভাব। আর কতক্ষণ? জার্নি আর খিদের ফলে সবাই কাহিল। এবার খাওয়ার পালা। কবি উত্তম কুমার বড়ুর সৌজন্যে একটি পারিবারিক হোটেলে আমাদের দাওয়াত পড়লো। বেশ কয়েক রকমের মাংস। কয়েক ধরনের মাছ আর বিভিন্ন রকমের সবজি রান্না। যা আমাদের চুয়াডাঙ্গার মতো নয়। খাবার পরিবেশন করছিল উপজাতি কয়েকজন তরুণ। এরমধ্যে ছিলেন সরকারি চাকুরে মং। উপজাতিতে চাকমা। আমরা তাকে মং দা’ বলে ডাকছিলাম। তিনি খেতে বসেছিলেন একদম আমার ডান পাশে। আমি খাওয়া দাওয়ার ফাঁকে মং দা’র কাছ থেকে কয়েকটি চাকমা শব্দ শিখে ফেললাম। আমং চাপো। অর্থাৎ ভাত খাবো। ‘আমং’ মানে ভাত। আর ‘চাপো’ মানে খাওয়া। খাওয়ার মেনুতে ছিল শুটকি মাছ। শিখে নিলাম- ‘ঙা’ মানে মাছ। আর আখরা মানে শুটকি। অর্থাৎ ‘ঙা আখরা’ মানে শুটকি মাছ। খাওয়া শেষে হোটেলের পাশেই দেখলাম বেশ কজন উপজাতি শিশু ক্যারামবোর্ড খেলছে। শখ হলো তাদের সাথে ছবি উঠবো। কিন্তু ভিন এলাকা। আলাদা জাতি ও সংস্কৃতি। বলাতো যায় না কী করতে গিয়ে কী হয়ে যায়। তাই সাহায্য নেয়া হলো মং দা’র। মং দা’ তাদের ভাষায় কী যেন বললেন, অমনিই শিশুরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে গেল ছবি ওঠার জন্য। কাজল ভাই, অর্থাৎ কাজল মাহমুদ ওইসব শিশুর পাশে বসে খানিক খেলাও দেখছিলেন। বুঝতে চেষ্টা করছিলেন তারা কী বলে। কিন্তু না, তাদের ভাষা কিছুই বোঝা গেল না।
প্রকৃতি অকৃপণভাবে সাজিয়েছে খাগড়াছড়িকে। স্বতন্ত্র করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যে। এখানে রয়েছে আকাশ-পাহাড়ের মিতালি। চেঙ্গি ও মাইনি উপত্যকার বিস্তীর্ণ সমতল ভূ-ভাগ ও উপজাতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্রতা। মহালছড়ি, দিঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা যেদিকেই চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। উঁচু নিচু পাহাড়, পাহাড়ি পথ, ছোট ছোট ছড়া। পাহাড়ের বুক চিরে গড়িয়ে পড়া পাহাড়ি ঝরনা আর ঐতিহ্যময় পাহাড়ি জনতার নির্মোহ চলন খুবই আকর্ষণ করে। অন্যদিকে ফুলের সুবাস, বৃক্ষের রকমতা কিংবা পাহাড়ের ঢালে গভীর গিরিখাদে সেগুন-গামারির বিশাল বাগান, পাহাড়ের চূড়া হাতছানি দিয়ে ডাকে প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বা ভ্রমণবিলাসীদের। বিশেষ করে জেলা সদরের নিকটবর্তী আলুটিলা পাহাড় আর চেঙ্গি নদীর এঁকেবেঁকে চলার অপরূপ দৃশ্য বিমোহিত করে সবাইকে। এরই মাঝে আছে রহস্যঘেরা আলুটিলা সুড়ঙ্গ। যা পর্যটকদের কাছে এক বিস্ময়। এ ছাড়া আছে নুনছড়ি দেবতা পুকুর, রিছাং ঝরনা ও রামগড় লেক। এ বিস্ময়ের কথা শুনে আমরা আর চুপ থাকতে পারি না। সিদ্ধান্ত হলো বেলা ৪টায় সর্বোচ্চ আলুটিলা পাহাড় এবং রহস্যঘেরা পাহাড়ের সুড়ঙ্গ জয়ের।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা শুধু প্রকৃতিগত দিক থেকেই নয় আধুনিক দিক দিয়েও বেশ এগিয়ে এখন। এখানে আছে সিনেমা হল, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী। আছে প্রেসক্লাব, ব্যাংক ও জেলা কারাগার। তবে এখানকার প্রধান সমস্যা বিদ্যুত। ২৯৬ কিলোমিটার পাকা ও ২৬১ কিলোমিটার আধাপাকা রাস্তা রয়েছে। ফসলের মধ্যে ধান, গম, ভুট্টা, সরষে, তুলা ও শাকসবজি অন্যতম। জুম পদ্ধতিতেই এখানে সাধারণত চাষ করা হয়ে থাকে। ফলমূলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, তরমুজ ও আনারস উৎপাদিত হয়। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে গ্যাস। বনজ সম্পদ রয়েছে অঢেল। সেগুন, গামারি, কড়ই, গর্জন, চাপালিকা ও জারুল এরমধ্যে অন্যতম। উপজাতিদের মধ্যে খাগড়াছড়িতে আছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। তাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানে লোকসংখ্যা ৫ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে উপজাতি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৯০৪ জন। চাকমা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫ জন। মারমা ৫৫ হাজার ৮৪৪ জন। ত্রিপুরা ৬৭ হাজার ৩৪২ এবং অন্যান্য ৬৭৩ জন। হিসেব অনুযায়ী এখানে উপজাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষিতের হার শতকরা ৪১ ভাগ। খাগড়াছড়ি, দিঘিনালা, লক্ষ্মীছড়ি, মহলছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি ও রামগড় এই ৮টি উপজেলা নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা। যার আয়তন ২ হাজার ৬৯৯ দশমিক ৫৫ বর্গকিলোমিটার। সংসদীয় আসন ১টি। পৌরসভা রয়েছে ৩টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৫৪৭টি। এরমধ্যে কলেজ ৭টি। ৭১টি হাইস্কুলের মধ্যে ৫টি সরকারি। ৪২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২০টি সরকারি। ১০০টি বেসরকারি। কিন্ডারগার্টেন রয়েছে ৯টি। মাদরাসা আছে ৩৫টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুবই কম চোখে পড়লো। এসবের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। মসজিদ ২৫৫, বৌদ্ধ মন্দির ২৬৩, মন্দির ২০৭ ও ২৬টি গীর্জা রয়েছে খাগড়াছড়িতে।
![]() |
| রাঙামাটির ঝুলন্ত ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আমি আহাদ আলী মোল্লা |
বেলা ৫টার দিকে আমরা রিছাং ঝরনা দেখার জন্য আবার মাইক্রোতে উঠলাম। পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠতো লাগলো মাইক্রোবাস। মাইক্রোবাস একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। এবার শুধু নিচে নামার পালা। মাইক্রোবাস সেখানে আর যেতে পারবে না। ফলে পায়ে হেঁটেই ধীরে ধীরে নামতে হবে। পাহাড়ের গা ধরে ধরে আঁকাবাঁকা হেরিংবন্ড রাস্তা। পা টিপে টিপে রাস্তায় চলতে শুরু করলাম। এ রাস্তাটি পাহাড়চূড়া থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার নিচে নেমে গেছে। শুধু নামছি আর নামছি। প্রায় ১ ঘণ্টা পর পৌঁছুলাম রিছাং ঝরনার কাছে। যেখানে উঁচু পাহাড় থেকে ঝরনার ধারা নিচে আছড়ে পড়ছে। আমাদের সাথে থাকা অন্যরাতো দূর থেকে দেখেই খালাস। কারণ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সবার মধ্যেই একটা অজানা ভয় কাজ করছে। অচেনা অজানা এলাকা। তারপরেও শোনা যায় পাহাড়িরা এখান থেকে মানুষ অপহরণ করে গভীর অরণ্যে নিয়ে যায়। মুক্তিপণ আদায় করে। এসব কথা শুনে কেউ সাহস করে এগুলো না। গা ছমছম করছে। নির্জন পাহাড়ের চারিদিকে শুনশান নীরবতা। কোথাও যেন কারো সাড়া শব্দ নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু এত দূর থেকে এসে সামান্য ১০ মিনিটের জন্য রিছাং ঝরনার কাছে না যেয়েই ফিরে যাবো তা কি হয়? বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম। সাথে ডেকে নিলাম কাজল ভাইকে। কাজল ভাই সবসময়ই আমাকে কাছে কাছে রেখেছেন। এজন্য আমার খুব ভালো লাগছিলো। উঁচু পাহাড় বেয়ে ঝরনা হয়ে নেমে আসছে পানি। সে এক অনন্য সৌন্দর্য। কয়েকটা ছবি উঠলাম আমি ও কাজল ভাই। এরপর পাহাড় বেয়ে কবি উত্তম কুমার বড়ুয়ার সাথে যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠছি, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। খুব কষ্ট করে উঠছি আর কথা বলছি উত্তম কুমার বড়ুয়ার সাথে। উনি ডায়াবেটিস রোগী। আমরা হাঁপিয়ে গেছি। কথা বলছি আর হাঁপ ছাড়ছি। গা দরদর করে ঘামছে। গায়ের জামা ভিজে জবজবে হয়ে উঠেছে। পাহাড়চূড়ায় পৌঁছুলাম। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। খানিকটা এসেই উপজাতি এক মহিলার দোকান। সেখানে চা খাওয়ার বিরতি। আকাশে চাঁদ উঠেছে। পাহাড়ে পাহাড়ে চাঁদের আলো কী এক অপরূপ আর মায়াময় পরিবেশ গড়ে তুলেছে। তা না দেখলে বোঝানো যাবে না। তেষ্টা পেয়েছিলাম। পাহাড়ি দোকানি মহিলাকে বললাম পানি পাওয়া যাবে? তিনি গেলাসে করে পানি দিলেন। আমি পর পর দু গেলাস খেলাম। জিজ্ঞেস করলাম কোথাকার পানি? দোকানি জানালেন পাহাড়ি কূপের পানি। এখানে চরম পানি সংকট। পাহাড় থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় এরা পানি সংগ্রহ করে খায়। এর বিকল্প খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
রাতে আবাসিক হোটেলে ফেরার পর খাগড়াছড়ি শহরের বাণিজ্য মেলায় গেলাম আমরা। পাহাড়িদের কেনাকাটা দেখে বেশ ভালো লাগছিল। উপজাতি মহিলারা বিশেষ ধরনের পোশাক আর এক ধরনের ব্যাগ হাতে নিয়ে সওদা করছে। বাঙালি পুরুষ-মহিলারাও মেলায় কেনাকাটা করছে। যেখানে উপজাতি আর বাঙালিদের মিলনমেলা। স্টলগুলোতে বাঙালিদের জন্য যেমন পোশাকআশাক রয়েছে, তেমনি উপজাতিদের জন্যেও আছে। দেখলাম উপজাতি যুবতীদের স্টল। তারা বাংলা ভাষায় কথা বলছে। তবে তারা উপজাতিদের সাথে কথা বলার সময় ঠিকই নিজের ভাষা ব্যবহার করছে। সকালেই রাঙ্গামাটি রওনা দিতে হবে। মেলায় আরো বেশিক্ষণ ঘোরাফেরার ইচ্ছে থাকলেও তাড়াহুড়ো করে হোটেলে ফিরতে হলো। রাতের খাবারের জন্য এবার আরেক হোটেলে। সেই আগের মতোই এক উপজাতির হোটেল। নাম খাংময় রেস্তোরা। মং দা’র কাছে শুনলাম এটা চাকমা ভাষা। ‘খাংময়’ শব্দের অর্থ বন্ধুত্ব। বেশ খাতির যত্নের সাথেই আমাদের আপ্যায়িত করলেন কবি উত্তর কুমার বড়ুয়া। হোটেলে ফিরেই তাগিদ শুরু হলো সকাল ৭টার মধ্যে রেডি হতে হবে। ৯টায় আমাদের রাঙ্গামাটির বাস।
১৭ ফেব্রুয়ারি। সকালে গোসল সেরে আমরা তৈরি। হোটেল চত্বরে শুরু হলো ফটোসেশন পর্ব। এরই মধ্যে ঘটির কাঁটায় সকাল ৮টা। বাসস্ট্যান্ডে বাঙালি এক হোটেলে নাস্তা সেরে শান্তি পরিবহনে চাপলাম সবাই। পাহাড়ি পথ ধরে ছুটলো বাস। কোথাও সবুজ পাহাড় কোথাও নীল আবার কোথাও কুয়াশা পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় বিশেষ কায়দায় উপজাতিদের ঘরবাড়ি। বিস্ময়ে যেন চোখে পলক পড়ে না। মাঝপথে খানিক বিরতি দিলে দেখলাম উপজাতি এক মহিলা বিশেষ কায়দায় বাঁশের তৈরি হুঁকো টানছেন। দৃশ্যটি বেশ ইনজয় করলাম। পথে অনেক স্থানে সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। মানিকছড়ি, হিমছড়ি, সাপছড়ি, পানছড়ি, ঘিলাছড়ি এ রকম ছড়ি দিয়ে স্থানের নাম। ছড়ি অর্থাৎ পাহাড়। প্রধান সড়কের পাশে ঘিলাছড়ি আর্মি ক্যাম্প। আর্মি ক্যাম্পটি ছাড়িয়েই ঘিলাছড়ি বাজার। আমাদের বাসটি ঘিলাছড়ি বাজারে থামতেই ছুটে এলেন এক আর্মি সদস্য। তিনি বাসে উঠে ড্রাইভারকে বললেন এ বাস যাবে না। বাসটিকে পিছিয়ে আর্মি ক্যাম্পে নেয়ার জন্য বললেন তিনি। বাসের যাত্রীরাতো ভয়ে হিম! কী ব্যাপার? কী অপরাধ? আমাদের চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের একজন বাসের জানালা দিয়ে মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করেছেন। এটা আর্মি ক্যাম্প থেকে ফলো করা হয়েছে। আমরা সবাই সরি বললাম। কিন্তু হলো না। তিনি জানালেন স্যারের নির্দেশ এ বাসকে আর্মি ক্যাম্পে নিতেই হবে। কী মুশকিল! অপরিচিত জায়গা। কী না জানি কী হয়। শেষমেশ আর্মি ক্যাম্পে পিছিয়ে গেল বাস। অভিযুক্ত হলেন আমাদেরই এক সঙ্গী। তিনিই আপন খেয়ালে বাসের জানালা দিয়ে ভিডিও করেছেন। আর্মি ক্যাম্প এলাকার ছবি ধারন নিষিদ্ধ। এ বিষয়টি তিনি না জেনেই করে ফেলেছেন। তাছাড়া এ ব্যাপারে সতর্কীকরণ কোনো বিজ্ঞপ্তিও কোথাও টাঙানো নেই। কিন্ত কে শোনে কার কথা। যেহেতু আর্মি অফিসারের নির্দেশ তাই সেখানে নামলেন অভিযুক্ত ভিডিওধারণকারী। সাথে গেলেন সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ ভাই ও সাধারণ সম্পাদক বন্ধুবর জাহিদুল ইসলাম। আর্মি কমান্ডিং অফিসারের কাছে গিয়ে সরি বললেন তারা। এরপর আবার বাস ছুটলো রাঙ্গামাটির দিকে। জানলাম আগেভাগেই রাঙ্গামাটির হোটেল ডিগনিটিতে আমাদের সিট বুকিং দেয়া আছে। বেলা সোয়া ১১টায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার ডিগনিটি হোটেলের সামনে আমাদের বাসটি এসে থামলো। সবাই ঝপাঝপ নেমে পড়লাম। হোটেলের বেলকনি থেকে লেকের অংশবিশেষ নজরে পড়লো। মনকাড়া এক অপরূপ দৃশ্য। বারবার আকর্ষণ করছে। আমরা হোটেলে ব্যাগব্যাগেজ রেখে বেরিয়ে পড়লাম পর্যটন এলাকায়। সিএনজিযোগে বেলা সোয়া ১২টার দিকে রওনা হলাম পর্যটনে। চোখে পড়লো হ্রদ-পাহাড়ের অকৃত্রিম সহাবস্থান। যা দেশের আর কোথাও মেলে না। হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য পর্যটকদের সহজেই কাছে টানে। সিএনজিতে যেতে যেতে একটি জিনিস উপলব্ধি করলাম, শহরের কোথাও রিকশা নেই। পরে জানতে পারলাম। রাঙ্গামাটি দেশের একমাত্র জেলাশহর যেখানে রিকশা নেই। রিকশামুক্ত শহরটি কী না মনোরম। খানিক যেতেই চোখে পড়লো পর্যটন মোটেল। পাশেই ঝুলন্ত সেতু। বিস্ময়ে চোখ মাথার ওপরে উঠে গেল। আরে তাইতো! এই সে ঝুলন্ত সেতু। এটি কতবারই না টেলিভিশনে দেখেছি। আজ বাস্তবে নিজের চোখে দেখলাম। আমরা হেঁটে হেঁটে ঝুলন্ত সেতু পার হলাম। সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। প্রকৃতির সাথে মানুষের ভালোবাসার আরেক মহিমা রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত সেতু। ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ মনোহর এ সেতুর ওপর উঠেই শুরু হলো আমাদের ফটোসেশন। সেতুর দু’ ধারের হ্রদ যেন কানাকানি করছে সবুজ পাহাড়ের সাথে। এখান থেকে দৃশ্যমান হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দূরের দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া পাহাড়ের সারি এখানে তৈরি করেছে এক নৈসর্গিক আবহ। এই হ্রদে নৌভ্রমণ যে কারো মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেয় প্রকৃতির আপন মহিমায়। প্রকৃতি এখানে কতটা অকৃপণ হাতে তার রূপসুধা ঢেলে দিয়েছে তা দূর থেকে কখনোই অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে ভেদভেদির মোড় থেকে ট্রলারে উঠলাম সুবলং ঝরনা দেখার উদ্দেশে। ট্রলার রিজার্ভ করা হলো। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের ১৩ জন ছাড়া বাইরের মানুষ একজন প্রদর্শক আর মাঝি। সব মিলে ১৫ জন। হ্রদে নাম না জানা পাখিদের মিতালি আর দু’ পাশের পাহাড়গুলোর চুপচাপ চোখাচোখি দেখে মনে হচ্ছিলো আমরা কোনো স্বপ্নপুরীতে এসে পড়েছি।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। পাহাড় নদী ও লেকবেষ্টিত একটি বৈচিত্রময় জনপদ এটি। যেখানে চাকমা, মারমা, তাঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক, পাঙখোয়া, লুসাই, সুজে সাঁওতাল, রাখাইন, অসমীয়া, গুর্খা সর্বোপরি বাঙালিসহ ১৬টি জনগোষ্ঠীর বসবাস। ভৌগলিক বৈচিত্রময় সৌন্দর্য এবং বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির সম্মিলন এক ভিন্ন মাত্রার যোগ করেছে এখানে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের বৃহত্তম এ জেলার জনসংখ্যা ৫ লাখ ২৫ হাজার ১ শ। ১০টি উপজেলা ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ জেলার আয়তন ৬ হাজার ১ শ ১৬ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটার। জেলা শহর থেকে দুটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকা দুটি হলো দৈনিক গিরি দর্পণ ও দৈনিক পার্বত্যবার্তা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫১৮। এর মধ্যে ৩৯১টিই সরকারি। রয়েছে কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ জেলার বরকল উপজেলায় সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ রয়েছে। নাম থাংনাং। উচ্চতা ২ হাজার ৪ শ ৯ ফুট। মোট কথা প্রকৃতির সাথে ভাব জমাতে হলে রাঙ্গামাটি যাওয়ার বিকল্প নেই।
আমরা ট্রলারযোগে প্রায় ১ ঘণ্টা যাওয়ার পর কাঙজির মুখ নামক এলাকায় পৌঁছুলাম। সেখানে ট্রলার থামিয়ে উঠলাম একটি পাহাড়ে। স্বচ্ছ পানির হ্রদে ঘেরা ওই পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে একটি খাবারের হোটেল। দেশ বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড় ওই হোটেলে। এ এলাকায় খেতে হলে ওই হোটেল ছাড়া কোনো উপায় নেই। খাবারের দামও চুয়াডাঙ্গার চেয়ে ৫ গুণ বেশি। হোটেলের নাম ‘চাংপাং’। জিজ্ঞেস করে জানলাম এটি চাকমা ভাষা। বাংলায় যার অর্থ ‘চাওয়া পাওয়া’। কিন্তু চাওয়া পাওয়ার কী ঠেলা তা হোটেলে যারা খেতে যায় তারাই টের পায়। আধাঘণ্টারও বেশি প্রতীক্ষায় থাকার পর আমরা প্লেট পেলাম। থালা আর হাত ধুয়ে বসে থাকতে হলো আরো কয়েক মিনিট। পরে ভাত পেলাম। কে যেন বললো হোটেল আমাদের বাঁশ দেবে। কথাটি শোনার পরে থতমত খেয়ে গেলাম। না জানি কী হয়! ভিন এলাকা। লক্ষ্য করলাম হোটেলের মালিক থেকে শুরু করে বয় বেয়ারা সবাই চাকমা। মুরব্বিরা বলেন এক দেশের বুলি আরেক দেশের গালি। না জানি আমাদের কোনো কথা ওদের কাছে গালি মনে হয়েছে কি না । সত্যি সত্যি বাঁশ দিয়েই চাংপাং হোটেলের লোকজন আমাদের আপ্যায়িত করলো। বাঁশ দিলেও সে বাঁশ পেয়ে দেখলাম সকলেই খুশি। কেউ কেউ বলছে আমাদের টেবিলে বাঁশ দাও। কিছুক্ষণ পরেই টেনশন কাটলো। দেখলাম এক হাত লম্বা বাঁশ। বাঁশের ফাঁপার ভেতরে বিশেষ কায়দায় মাংস রান্না। এবার বুঝুন ও বাঁশতো সবাই নিতে চাইবেই। খাওয়া শেষে ফরাসি এক পর্যটকের সাথে ফটোসেশন করলাম আমি ও কাজল ভাই। খানিক পরেই আবার ট্রলারে উঠে শুরু হলো যাত্রা। আমরা যাচ্ছি সুবলং ঝরনা দেখতে। রাঙ্গামাটি থেকে যার দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। শুনলাম প্রায় ৩ শ ফুট উঁচু থেকে আছড়ে পড়ে ঝরনা। সুরের মূর্ছনায় পর্যটকদের হৃদয় জুড়িয়ে যায়। মনটা ব্যাকুল হলো দেখার জন্য।
দু ধারে বিশাল ও বিরাট বিরাট উঁচু পাহাড় মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা হ্রদের পানি। এ যেন এক অন্য জগত। যতই দেখি মন ভরে না। একেকটি পাহাড় দেখতে একেক রকম। এসব পাহাড়ে বাস করে উপজাতিরা। পানিপথ ছাড়া তাদের শহরে যোগাযোগের কোনো রাস্তা নেই। সে এক অন্যরকম জীবন তাদের। বেলা যখন প্রায় ৩টা, তখন সুভলং ঝরনার উৎসমুখে পৌঁছুলাম। কিন্তু কপাল মন্দ। সুবলং ঝরনাধারা দেখতে পেলাম না। সুষ্ক মৌসুম হওয়ার কারণে ঝরনাধারা নাকি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ঝরনাধারার চারপাশের প্রকৃতির রকমারি সৌন্দর্য দেখে বিমুগ্ধ আমরা। আর ইচ্ছেই করছিল না ফিরে আসি। বেলা গড়িয়ে গেছে। ঘটির কাঁটায় যখন ৩টা ১৭। রাঙ্গামাটি ফিরে আসার জন্য ট্রলার আবার ছুটলো। ট্রলারে বসে আমাদের অনেকেই ছবি তোলায় ব্যস্ত। কেউ কেউ ভিডিও করছেন। হ্রদের পানির সাথে আমাদের আনন্দও যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছিলো। দূর থেকে রাঙ্গামাটি জেলা শহর তখন দেখা যাচ্ছিল। সূর্য ডুবু ডুবু। ঠিক সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আমরা ঝুলন্ত সেতুর কাছে এসে নামলাম। আবারও ফটো তোলাতুলি চললো খানিক্ষণ।
সন্ধ্যার পর রাঙ্গামাটি রাজবন বৌদ্ধবিহার পরিদর্শনে গেলাম আমরা। বিশাল বড় এলাকা। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মূল মন্দিরে গিয়ে দুজন প্রার্থনারত। গৌতম বৌদ্ধের মূর্তির সামনে আবছায়া আলোয় যে দুজন হাত জোড় করে প্রার্থনা করছেন তাদের মধ্যে একজন উপজাতি যুবতী। কয়েক মিনিট পরেই ওই যুবতী দাঁড়িয়ে আমাদের সাথে কথা বললেন। তিনি চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ গিয়েছেন বলে জানালেন। আমাদের কিছু জানার ছিল। কিন্তু তার কাজ আছে বলে জানিয়ে তিনি চলে গেলেন। ছবি তোলা নিষেধ। তাই আমাদের কেউই ক্যামেরা তাক করলেন না। বৌদ্ধ বিহার থেকে ফেরার পথে বেশ কিছু দোকান চোখে পড়লো, যেখানে উপজাতি মহিলারা দোকানদারি করছেন। এক দোকান থেকে চাকমা হরফে লেখা স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ শেখার বই কিনলাম। শহরে ঢুকে হোটেল খোঁজাখুঁজি চলছে রাতের খাবারের জন্য। হঠাৎ প্রধান সড়কে একটি মিছিল। স্লোগান আসছে হরতাল, হরতাল। বিষয়টি জানার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। কী ব্যাপার, হরতাল কেন? আগামীকাল শুক্রবার। ছুটির দিনেতো হরতালের ডাক পড়ে না। পরে জানতে পারলাম। রাঙ্গামাটির গহীন অরণ্যে একজন বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। বাঙালিরা এ হত্যার দায় পাহাড়িরে ওপর চাপাতে চাইছে। এ জন্য আগামীকাল ১৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার হরতাল আহ্বান করেছে বাঙালি একটি সংগঠন। বান্দরবানে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিমত দেখা দিল আমাদের মধ্যে। কারো কারো মত আগামীকাল বান্দরবানে যেতে হবে। কেউ কেউ বললেন সরাসরি কক্সবাজার। এ নিয়ে একটুআধটু মুখ কালাকালি হলো আমাদের মধ্যে। তবে হরতাল আহ্বানের কারণে পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বান্দরবান ভ্রমণ বাতিল করা হলো। হোটেলে ফিরে সাংবাদিক হোসেন জাকির রাঙ্গামাটির সাবেক জেলা প্রশাসক নূরুল আমিনের কাছে মোবাইল করলেন। তিনি খানিক বাদে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপ করে জানালেন সকাল ৮টার মধ্যে শহর ছেড়ে যেতে হবে। না হলে হরতালে বাধা পড়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই সিদ্ধান্ত হলো কক্সবাজার যাওয়ার।
![]() |
| কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আমি আহাদ আলী মোল্লা |
প্রায় দুশ’ কিলোমিটারের যাত্রা কক্সবাজার। না, আর ভাল্লাগছে না। বসে থেকে থেকে মাজা লেগে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে একটু হাঁটতে। কিন্তু তা তো আর সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেলা ৩টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের প্রধান সড়কের ধারে একটি বাজারে দুপুরের খাবার বিরতি পেয়ে খানিকটা মাজা সাট করে নেয়া হলো। খাবারের অবস্থা খুব খারাপ। মুখে আর ঢোকে না। কিন্তু খেতে যে হবেই। শেষমেশ তেলাপিয়া আর কেউ কেউ কাচ্চি মাছ দিয়ে খেয়ে নিলাম। আমাদের পরিবহনটি ধীরে ধীরে কক্সবাজারের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা রাস্তার মাইলপোস্ট দেখে আশ্বস্থ হলাম আর কয়েক মিনিট গেলেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত কক্সবাজারে পৌঁছে যাব। আগেভাগেই এনজিও সংস্থা পালসে আমাদের ১৩ জনের সিট বুকিং দেয়া আছে। বাসটি ঠিক ৫টার দিকে থামলো পালসের সামনে। তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নেমে হোটেলে উঠলাম। নামার সাথে সাথে পোশাক বদলে রেডি হলাম সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার জন্য। আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য ডুবে যাবে। সমুদ্রে সূর্য ডোবার অপরূপ দৃশ্যের কথা শুনলেও আমরা অনেকেই তা দেখিনি। মনটা ছটফট করছে। এখনই সেই সময়। পালস থেকে সাগর সৈকত আরো দু কিলোমিটারের পথ। না। হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে। রাস্তার ধারে আসতে না আসতেই একটি আলমসাধু এসে থামলো। তাতে চাপলাম কয়েকজন। সাগরের কূলে নামলাম। বিশাল সাগরের অসংখ্য মাতাল ঢেউ আছড়ে আছড়ে পড়ছে কূলে এসে। ঢেউয়ের সে কী গর্জন। সাগরের পাড়ে অসংখ্য পর্যটকের ভিড় থাকলেও পানিতে কেউ নেই। একলা একলা কেমন যেন গা ছমছম করছে। সাগরের বিশালতা দেখে ভয় পাওয়ারই কথা। কোনো সীমানা নেই। দিগন্ত জোড়া সাগরে শুধু নীল পানিতে টইটম্বুর। দূরে চোখ দিলে কোথাও কোথাও খড়কুটোর মতো চোখে পড়ছে মাছ ধরা নৌকা বা ট্রলার। সাগরে জোয়ার-ভাটা হয়। আমরা যে সময় গেলাম তখন জোয়ারের সময়। না, আর দেরি করলাম না। দৌড়ে নেমে পড়লাম সাগরের পানিতে। আমার সাথে নামলেন সাংবাদিক যাহীদ জীবন। পরে নামলেন কাজল মাহমুদ। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আমরা ৩ জন ছাড়া পানিতে আর কেউ নেই। লাফ দিয়ে দিয়ে ঢেউয়ের সাথে খেলতে লাগলাম। একটু বেশি পানিতে গেলেই কাজল ভাই বারণ করছেন। আর এগিয়ো না। যদি কোনো কিছু হয়ে যায় আর ফিরতে পারবে না। সাগরের পানিতে বিভিন্নভাবে আমরা ছবি উঠলাম। হোসেন জাকিরকে দেখলাম হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে সাগরের সৈকতে টুকটাক হাঁটছেন। মাঝে মাঝে ক্যামেরার আলো জ্বালাচ্ছে বন্ধুবর জাহিদুল ইসলাম। একই সাথে গোলাম কবীর মুকুল আর জেড আলম ভাই সাগরের উতলা ঢেউ অবলোকন করছেন। আর ছবি তোলার পাশাপাশি মজা করছেন বিভিন্নভাবে। হোসেন জাকিরের মতো রিচার্ড ভাই অর্থাৎ রিচার্ড রহমান পায়চারি করছিলেন সাগরের হাঁটু পানিতে। সূর্য ডুবু ডুবু। এইতো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সাগরের অতলতলে স্নান সেরে বিশ্রামে যাবে। প্রকৃতির কী যে আহ্বান। তা অনুভব করছিলাম। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। সূর্য ডুবে গেলে আমাদের গোসল শেষ হলো। পালসে ফিরে মার্কেটে বেরুলাম সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে।
বছর তিনেক আগেও একবার কক্সবাজার ভ্রমণে এসেছিলাম। তখন কক্সবাজার ছিল অনেকটা নিরিবিলি। সাগরের সৈকতগুলোও ছিল খোলামেলা। এখন সৈকত দখল বেদখল করে গড়ে উঠছে বিশাল বিশাল আবাসিক হোটেল। সৈকতের পাশেই বসেছে বাজার। প্রকৃতি যেন মানুষের কাছে হার মেনে যাচ্ছে। শহরে ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে মনে হলো তিন বছর আগের সেই কক্সবাজার এটা নয়। আমুল বদলে গেছে। একেবারে দশ থেকে পুরো একশো। যানবাহনের ভিড়ে শহরে ঢোকাই এক জ্বালা। ফাঁকা কোনো জায়গা নেই। বাড়ির ওপর বাড়ি। গাড়ির পাশে গাড়ি। এ যেন আরেক ঢাকা। ব্যস্ততার শেষ নেই। না জানি আর দু বছর পর কক্সবাজার কিসে পরিণত হবে। গেলাম ঝিনুক মার্কেটে। তারপর বার্মিজ মার্কেটে। পর্যটক যিনিই আসেন এই বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটার জন্য একবার অবশ্যই ঢু মারেন। আমরাও শখের বশে বাজার করতে ঢুকলাম। আমাদের দেশের মতো বার্মিজ কাপড়চোপড় উন্নত মানের নয়। তবে অন্য দেশের জিনিস বলে কথা। আমাদের সাথে থাকা অন্যরা রাত ১০টার মধ্যে হোটেলে ফিরে গেলেও জাহিদুল ইসলাম, রিচার্ড রহমান, যাহীদ জীবন, আবুল কাশেম আর আমি বাজার সেরে ফিরলাম রাত সাড়ে ১১টার দিকে।
![]() |
| দেশের খ্যাতিমান কয়েকজন ছড়াকারের সাথে বই মেলায় আমি আহাদ আলী মোল্লা |
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন