রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১১

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১

            ভোরে যখন ঘুম ভাঙলো তখন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মোবাইলফোনে কথা বললাম আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ি বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের কাছে। তিনিও যশোরে যাবেন। জানালেন এতো বৃষ্টির মধ্যে আজ যাওয়া সম্ভব হবে না। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। সাড়ে ৮টার দিকে জেগে দেখি তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। নিম্নচাপ শুরু হয়েছে। তাই সহজেই বৃষ্টি থেমে যাবে তা আশা করা যায় না।
            ১৮ সেপ্টেম্বর আমাদের পরিবারের জন্য একটি বেদনার দিন। আজ থেকে ২৭ বছর আগে আমাদের একমাত্র বোন নাহারন মরাগাঙে ডুবে মারা গিয়েছিল। আমরা ৭ ভাই-বোন ছিলাম। ৬ ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিল সে। ৪ ভাইয়ের পিঠে তার জন্ম। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে বন্যা দেখা দিয়েছিল। চারিদিকে পানি। আমি তখন চুয়াডাঙ্গা আলিয়া মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বন্যার কারণে আমাদের অনেক মাঠ ডুবে গিয়েছে। ঢেলাগাড়ি ছিল ঝালের আবাদ। ঝালগাছ মরে যাচ্ছে। তাই বাড়ির তাগিদে আমরা কভাই মিলে ঝাল তুলতে গেলাম। মরানদী পানিতে টইটম্বুর। কলার ভেলা বুকে দিয়ে আমি ঢেলাগাড়ি মাঠে গেলাম। মাঠ থেকে ঝাল তোলা শেষে বাড়িতে ফিরলাম। তখন বেলা ১২টা। ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে যাবো বলে তৈরি হচ্ছিলাম। এরই মাঝে কানে এলো কে নাকি মরা গাঙে ডুবে মরেছে। মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমার নাহারন কই। আমি ছিপ রেখে মরাগাঙ পানে দৌড় দিলাম। বাড়ির কাছেই মরাগাঙ। গিয়ে দেখলাম গ্রামের আইজউদ্দিন নামের একজন ঘাড়ে করে নিয়ে আসছে সাহারনকে। সাহারন আমার মেজ চাচার মেয়ে। সেখানে মা খোঁজ করতে লাগলেন আমার মেয়ে কই। তখন আবার নতুনভাবে খোঁজ করে পাওয়া গেল আমার বোন নাহারনের লাশ। মনের খেদ মেটাতে মুন্সিগঞ্জের ডা. মজিবুর রহমানের কাছে নেয়া হলো। না। বেঁচে না থাকলে কি আর পাওয়া যায়। সেই যে আমাদের একমাত্র বোনকে হারালাম। প্রতিবছর এ দিনটি এলে আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তার মৃত্যুর সঠিক দিন-তারিখ আমি ছাড়া আর কেউই মনে রাখেনি। তাই আমার পরিবারের কাছে এ বিশেষ দিনটি কোনোভাবেই শিহরণ জাগায় না। তবে আমি ভুলতে পারি না। বারবার মনে পড়ে। প্রতিবছর আমি এই ১৮ সেপ্টেম্বর এলে একটি করে ছড়া লিখি বোনের জন্য। ভাই-বোনদের মধ্যে আমিই সবার বড়। তবু যেহেতু আমারও ছেলেবেলা ছিল তখন। তাই আদর করে আমার ছোট বোন নাহারনকে আমি কোনো দিনই কিছু কিনে দিতে পারিনি। এ কারণেই আমি দগ্ধ হই বারবার। অসহায়য়ের মতো নাহারন আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আজও বারবার মনে পড়ে তাকে। তার জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের মাঝখানে জায়গা করে দেন।
বিকেলে মুন্সিগঞ্জ একাডেমীর প্রধান শিক্ষক আতিয়ার রহমান ফোনে জানালেন যশোর শিক্ষাবোর্ড জেএসসি পরীক্ষার প্রিন্টআউট দিচ্ছে নিয়ে আসতে হবে। আগামীকাল সোমবার যখন যশোর বোর্ডে যাবোই একবারে দুটো কাজ সেরে আসবো। যশোর যাওয়ার ব্যাপারে বিকেলে আবার কথা হলো প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের সাথে। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলাম। হঠাত বুঝলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। আতঙ্কিত হয়ে পরিবারের অন্যান্যকে নিয়ে ঘরের ছাদে চলে গেলাম। পরে খবর শুনলাম রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে সারাদেশে। ঢাকায় একটি ভবন হেলে পড়েছে। কয়েকটি ভবনেফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব ছিল ২ মিনিট। নেপালের সিকিমের ৬৯ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পশ্চিমে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল। ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ পর আলমডাঙ্গা উপজেলার গাংনী ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউর রহমান রেজা মোবাইল করে জানালেন তার ইউনিয়নের মোচাইনগর গ্রামে শোয়াইব নামের ৭ বছরের বালক পানিতে ডুবে মারা গেছে। কিছুক্ষণ আগে একটি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আমাদের দেশের মানুষ আজও সচেতন হলো না। এ কারণেই এসব ছোটখাটো অঘটন ঘটে থাকে বলে আমার মনে হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন