মা বেশ কদিন বাড়ি ছেড়ে এসেছেন। তাই উনি কৃষ্ণপুরে ফিরবেন। আমি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাকে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম। বেলা ১১টায় নন এমপিও বেসরকারি শিক্ষক পরিষদ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার মিটিং ছিল। সময় মতো ওখানে যোগদান করলাম। দেখা হলো শিক্ষকনেতা শ্রীকোল বোয়ালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওসমান গনি, আবু সালেহ, নজরুল ইসলাম, সাইদুর রহমান, শান্তিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সাথে। ওখানে বসে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিছুক্ষণ পর ওখানে হাজির হলো স্নেহভাজন সাংবাদিক খাইরুজ্জামান সেতু ও সাইফ জাহান। তারা টেলিভিশনের জন্য আমার একটি মিনি সাক্ষাৎকার নিলো। শিক্ষক পরিষদের মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরলাম। সহধর্মিণী ফরিদা জানালো তার ছোটভাই আবু সাইদের মেয়ে হয়েছে। এক পুত্র সন্তানের পর এ তার দ্বিতীয় সন্তান। বেলা ১১টায় তার স্ত্রী বিউটি খাতুনের কোলজুড়ে আসে কন্যাসন্তান। দুপুরের খাবার খেয়ে অভ্যাস অনুয়ায়ী ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নিলাম। সন্ধ্যায় মাথাভাঙ্গা অফিসে উপস্থিত হয়ে কাজে যোগ দিলাম।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মুন্সি আবু সাইফ আমাকে নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেটি আজ দৈনিক মাথাভাঙ্গায় প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধটা বেশ চমৎকার হয়েছে বলে আমাকে অনেকেই ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নিবন্ধটা এখানে হুবহু দিয়ে দিলাম-
আহাদ আলী মোল্লা : অসাধারণ এক ছড়াকার
-মুন্সি আবু সাইফ
![]() |
| আমি আহাদ আলী মোল্লা |
আহাদ আলী মোল্লা চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাড়ি আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। তিনি মো: মকবুল মোল্লা ও মোছা: সাকিমা বেগমের পুত্র। বর্তমানে তিনি একটি প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় আঞ্চলিক দৈনিক সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া পেশাগত জীবনে তিনি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
স্ত্রী চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চাকুরিরত। দু সন্তানের পিতা আহাদ আলী মোল্লা সম্প্রতি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা আর লেখালেখির মধ্যে আত্মনিমগ্ন আছেন সদালাপী এই ছড়াকার। বিশেষ করে ‘টিপ্পনী’ লিখে চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশ কয়েকটি জেলায় একনামে পরিচিত আহাদ আলী মোল্লা। ছড়া লিখে এমন পরিচিতি পাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে বিরল।
আহাদ আলী মোল্লাকে যারা ‘টিপ্পনী’ রচয়িতা হিসেবে জানেন তারা আহাদ আলী মোল্লার মূল প্রতিভার খণ্ডিত রূপকে চেনেন। আসলে তাঁর টিপ্পনীগুলো আমাদের দৈনন্দিন সমাজজীবনে ঘটে যাওয়া নানা অসঙ্গতির ফরমাইসে লেখার তীব্র ঝাঁকুনি। আমরা যারা আহাদ আলী মোল্লার অনেক উঁচুমানের মৌলিক ছড়া পড়েছি তারা উপলব্ধি করতে পারি কত বড় মাপের ছড়াকার তিনি। আমার বিশ্বাস তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যে একটি নতুন বলয় নির্মাণ হতে চলেছে। তাঁর ছড়া প্রতিভার স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগে ছড়া সাহিত্যের শিল্পিত কোনো রূপ চোখে পড়ে না। মূলত কলকাতার রায় পরিবারের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে ছড়া রচনার সূত্রপাত। সুকুমার রায় প্রথম সার্থক বাংলা ছড়াকার। এ সময়ের ছড়া সাহিত্যকে শিশুতোষ কবিতা হিসেবে ধরা হতো। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে অনেক জীবনঘনিষ্ঠ ছড়া রচিত হয়েছিল। যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘নিষ্কৃতি’ ছড়া ছন্দে লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা। তারপর কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদদীন, অন্নদা শঙ্কর রায় প্রমুখের হাত ধরে বাংলা ছড়া সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে লুৎফর রহমান রিটন, ফারুক নওয়াজ, আমীরুল ইসলাম ও নাসের মাহমুদের পরেই আহাদ আলী মোল্লা বাংলা ছড়া নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আহাদ আলী মোল্লার ‘হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’ ‘খবর আছে’ ‘পাওয়ার পার্টির লোক’ ‘মাথাভাঙ্গার ঘাট’ ইত্যাদি ছড়াগুলো যারা পাঠ করেছেন তারা অনুধাবন করতে পারেন যে, কত বড় মাপের ছড়াকার তিনি। বিশেষত ছাড়া ছন্দের যে সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ রয়েছে তা নিয়ে তিনি প্রতি নিয়ত নানা রকম পরীক্ষা করছেন এবং বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যকে বৈচিত্র্যময় করে তুলছেন। ছড়া ছন্দের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা আহাদ আলী মোল্লার আগে বাংলা সাহিত্যে আর কেউ করেছেন কি-না তা আমার জানা নেই। তাঁর রচিত হাজার হাজার ছড়ার প্রতিটিতেই তিনি নানা ধরনের শৈল্পিক পরীক্ষা করেছেন। কী ছন্দ, কী শব্দ চয়ন, কী চিত্রকল্প সৃষ্টি, সব ক্ষেত্রেই তিনি অনন্য মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারছেন।
আহাদ আলী মোল্লার আরেকটি বড় কৃতিত্ব শব্দ নির্মাণ কৌশল। জার্মান লোক কাহিনী অবলম্বনে রচিত হ্যামিলনের বাঁশিঅলা ছড়াটিতে তিনি যত ইঁদুরের নাম উল্লেখ করেছেন তার সব হয়তো অভিধানে পাওয়া যাবে না। ইঁদুরের নানামুখী নামকরণের ক্ষেত্রে তিনি যেসব শব্দ ব্যবহার করেছেন সেগুলো তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। এভাবে আহাদ আলী মোল্লা নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারকে সমৃদ্ধ করছেন। তাছাড়া তিনি অনেক হারিয়ে যাওয়া শব্দকে নতুন করে ফিরিয়ে এনে ছড়ার মধ্যে প্রয়োগ করছেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটা অতি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। গ্রামীণ জীবনের বিস্মৃত প্রায় অনেক শব্দ তিনি ছড়ার মধ্যে তুলে এনেছেন। জীবনানন্দ দাশের পর তিনিই বাংলা শব্দ অনুসন্ধানী কবি। জীবনানন্দের শব্দগুলো আটপৌরে গ্রামীণ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হলেও প্রয়োগ ক্ষেত্রে তা উচ্চমার্গের ও আরোপিত কৃত্রিমতায় ইউরোপীয়ান স্টাইলে বর্ণিত। কিন্তু মোল্লার ছড়ার শব্দযোজনা গ্রাম্য সরলতায় পরিপূর্ণ।
‘প্রচারেই প্রসার’ কথাটি যদি সত্যি হয়, তাহলে আহাদ আলী মোল্লা কেন একটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ করছেন না? আমি এ ব্যাপারে তাঁকে বহুবার অনুরোধ করেছি কিন্তু মোল্লা নিজে খরচ করে কোনো গ্রন্থ প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন। কোনো প্রকাশনা সংস্থা এগিয়ে এলে তিনি গ্রন্থ প্রকাশে সম্মত আছেন। এ ব্যাপারে আমার একটি বিষয় জানা আছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আবুল বাশার নামে একজন প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক রয়েছেন যিনি মুর্শিদাবাদের মানুষ। মুর্শিদাবাদেই অবস্থান করতেন। তাঁর লেখা যখন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছিল তখন তাঁর প্রতিভার খোঁজ শুরু হয়। আবুল বাশারকে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা কলকাতায় নিয়ে যায়। এখন তিনি একটি বড় পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা আশা করি আহাদ আলী মোল্লার প্রতিভারও মূল্যায়ন সম্ভব হবে। আমি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা তাঁর সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি তাঁর একটি একক ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হবে।
আহাদ আলী মোল্লা আমার একজন প্রিয় ছড়াকার। কোনো সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আলোচককে সবসময় নির্মোহ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টির পরিচয় দিতে হয়। মোল্লা যেহেতু হাজার হাজার ছড়া লিখে চলেছেন। ফলে তাঁর অনেক ছড়ার শিল্পিত মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে যা একজন বড় মাপের ছড়াকারের জন্য বিপজ্জনক। আমি আহাদ আলী মোল্লাকে বিষয়টির ওপর গুরুত্বদানের জন্য অনুরোধ করব। কারণ অনেক সস্তা লেখা কখনো কখোনো প্রতিভাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন