বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

শাড়ি

দেখিস দাদি আমি বড় হলে তোর কোনো দুঃখ থাকবে না দাদার মতো আমি তোকে ছেড়ে যাব না তোর ছোট্ট ঘর আনন্দে ভরিয়ে দেব কথাগুলো বলতে বলতে কচি হাত দিয়ে নাসিমা বেগমের দুচোখের অশ্রু মুছে দিল ইতি নাসিমা বেগম ছলছল চোখে ইতির মুখের দিকে একবার তাকালেন তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন আহারে কী মিষ্টি মিষ্টি কথা নাসিমার বুক জুড়িয়ে যায় কথাগুলো শুনে তিনি ভাবেন কেউই কাউকে কিছু দিয়ে কুলোতে পারে না কিন্তু ছোট্ট ইতির কথায় তার শূন্য বুকটা ভরে যায় প্রতিবেশী আরিফার মেয়ে ইতি বয়স  বছর  বছর সে মিশন স্কুলে ভর্তি হয়েছে লেখাপড়ায় বেশ ভালো পড়াশোনা নিয়ে তাকে কিছু বলতে হয় না খুবই লক্ষ্মী মেয়ে সে সন্ধ্যা-সকালে নিজের গরজেই পড়তে বসে যায় নাসিমা বেগমের কাছেই বেশিরভাগ সময় থাকে সে সেই এত্তটুকুন থেকে অনেকটা মায়ের মতোই লালন পালন করছেন তিনি পৃথিবীতে তার কেউ না থাকলেও ইতিকে নিয়ে তিনি যেন সব ভুলে থাকেন তবে মধ্যিমাঝে স্বামীর কথা মনে হলে কান্না ধরে রাখতে পারেন না আজ বিকেলে ঘরের আঙিনায় পাটি পেতে বসে ছিলেন নাসিমা পুরোনো দিনের সব কথা মনে পড়তেই চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি বেরিয়ে আসে আর ওই পানিই মুছে দিল ইতিজয়নগরের দরিদ্র ঘরের মেয়ে নাসিমা বছর পঁচিশেক আগে সামান্য এক সাইকেল মেকারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার তবে কোনো দুঃখ ছিল না মোটা ভাত মোটা কাপড়ে ভালোই চলত কিন্তু ২০/২২ বছরের সংসার জীবনে কোনো সন্তান হয় না তাদের এরই মধ্যে বছর কয়েক আগে অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান স্বামী জহির বড় একা হয়ে যান নাসিমা স্বামীর ছোট্ট টিনের চালায় তার বসবাস দুটো ছাগল আর হাঁস-মুরগি পুষেই চলে যায় হাত পাতেন না কারো কাছে কোনো এক আদর্শ লালন করেন তিনিনিঃসন্তান নাসিমার শেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় ইতি সন্তান না হলেও ইতিকে তিনি সন্তানের মতোই ভালোবাসেন ইতি তাকে দাদি বলে ডাকে ছোট্ট হলেও নাসিমার দুঃখ-কষ্ট বোঝে সে রাতে মায়ের কাছে থাকলেও স্কুল ছুটির পর বাকি সময় নাসিমা দাদির কাছেই কাটে তার মা-বাবার পাশাপাশি নাসিমার আদর-স্নেহে বড় হয় ইতি নাসিমার বয়স ষাট ছুঁইছুঁই চুলে পাক ধরেছে বছর আগেই ইতি আগে তার মাথায় বিলি কেটে দিত পাকা চুল একটা একটা করে তুলে দিত কিন্তু ইদানীং মাথা প্রায় সাদা দাদির সঙ্গে বেশ ইয়ারকি মশকরা করে ইতিএসএসসি আর এইচএসসিতে জিপিএ- পেয়ে পাস করে ইতি নাসিমার মনে আনন্দ ধরে না তবে বাড়ি থেকে যখন শহরের কলেজে ইতি পড়তে যায় তখন খুব একা লাগে নাসিমার নিজেকে বুঝ দেন তিনি ইতিতো পরের মেয়ে তার জন্য ব্যথা পেয়ে কী হবে মাঝে মাঝে টানা নিঃশ্বাস ফেলে কষ্টগুলো বুক থেকে বের করে দেন এদিক ওদিক থেকে ইতির বিয়ের কথা আসে কষ্টগুলো আরও গাঢ় হয় বিয়ের পর ইতিকে আর সেইভাবে কাছে পাব না এসব বলে বলে সেদিন প্রতিবেশী এক ভাবীর কাছে কষ্টগুলো শেয়ার করছিলেন নাসিমা আচমকা সেখানে হাজির হয় ইতি দাদির মুখ দেখেই ইতি বুঝে নেয় সে বলল দাদি তুই মিছেমিছে ভাবিস কেন আমি এখন বিয়ে করব না চাকরি পেয়ে আগে তোকে দেখব, তারপরে না বিয়ের কথা’‘এই পাগলি তাই কি হয় তোকে নিয়ে তোর মা-বাবার কত স্বপ্ন সেগুলো পূরণ করবিনে?’‘ওসব রাখো তো আদুরে ধমকের সুরে দাদির মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে ঘোমটা টেনে দিল ইতি কেটে যায় আরও দুবছর না সত্যিই বিয়ে করেনি ইতি এরই মধ্যে সে সরকারি চাকরি পেয়ে যায় চাকরিতে যাওয়ার আগে দাদির গলা ধরে বলে যায় আমি প্রথম মাসের বেতন তুলেই বাড়িতে আসব আর পয়লা বেতন দিয়ে তোর জন্য একটা শাড়ি কিনব নাসিমা খুব খুশি হন বলেন ওরে পাগলি শাড়ি লাগবে না তুই চাকরি পেয়েছিস আমি খুব খুশি হয়েছি এবার একটা বিয়ে করে সংসার পাত

ইতি বেতন পাওয়ার আগেই ফর্দ বানিয়ে ফেলে প্রথম মাসের বেতনে সে কী কী করবে তবে এক নম্বরেই লিখেছে দাদির শাড়ি মে মাসের ১২ তারিখ সে তিনদিনের ছুটিতে বাড়িতে ফিরছেসেদিন বৃহস্পতিবার দাদি নাসিমাও জানেন ইতির বাড়ি ফেরার কথা কিন্তু আজগুবি ঘটে যায় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা প্রায় দুপুর মাথার ভেতরে কেমন একটা চক্কর দিতেই পড়ে যান নাসিমা প্রতিবেশীরা ছুটে আসে এদিক ওদিক থেকে কেউ মাথায় পানি ঢালে, কেউ সোজা করে দাঁড় করাতে যায় কিন্তু না এক মিনিটেই সব ওলোট পালোট ডাক্তার এসে জানিয়ে দেন নাসিমা নেই বিকেলে দাফনের আয়োজন চলে এরই মধ্যে বাড়িতে পৌঁছায় ইতি তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে  কী শুনছে সে দাদির লাশ ছুঁয়ে হাউমাউ করে কাঁদে প্রথম বেতনের টাকায় দাদিকে শাড়ি কিনে দেব কিন্তু এখন কী হবে ইতির বাবা কাফন কিনতে যান বেতনের পুরো টাকা বাবার হাতে তুলে দিয়ে সে বলে কাপড়টা ভালো দেখে নিয়ো আব্বা
 ১৯ মে ২০১৬নিজবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন