নাম পটলা। উত্তরপাড়ায় পটোল চুরি করে ধরা
পড়ার পর ওকে ভালো নামে আর কেউ ডাকে না। কেউ কেউ পটলা চোর বলেও ডাকে। সেই থেকে ওর
মা-বাপের দেয়া নাম ডুবে গেল। গ্রামে যত অশান্তির কারণ এই পটলা। কার মুরগি চুরি,
কার পায়রা চুরি, কার বেগুন চুরি এই ওর কাজ। একবারতো একজনের আস্ত ছাগল জবাই করে
খেয়ে নেয় তারা ক'জন। কিচ্ছুটি বলার নেই। কিছু বললে রাতের অন্ধকারে ঘরে আগুন
জ্বালিয়ে দেবে। নানা হুমকি ধামকির মধ্যেই থাকে গ্রামের লোকজন। একবার গ্রামে সালিস
বসে। তাকে সালিসে ডাকা হয়। পটলার উগ্র আচরণ।-আমি কারো ধার ধারিনে। কারোর খাইনে।
আমার বুদ্ধি বেচে আমি চলি। পারলে কিছু করে নিয়ো। এই না বলে দম্ভভরে সালিস থেকে চলে
যায় পটলা। সেই থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে সে। একা নয়, তার সাথে আছে আরও ১০/১২ জন বেমক্কা যুবক।
যাদের চেহারা দেখলেই অনেকে ভয় পায়। রগচটা। নেশাখোর। তাদের কাজই পরের ক্ষতি করা। আর
ওদের ভয়েতো গ্রামের কয়েকজন মেয়ে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। স্কুলে যাওয়া-আসার
পথে তারা বটমোড়ে বসে নানান ভঙ্গিতে টোন করে। আজেবাজে কথা বলে। সুযোগ বুঝে ওড়না ধরে
টানে। গ্রামটি একেবারে ভারত সীমান্তঘেঁষা। সহজে
এ গ্রামে পুলিশকে দেখা যায় না। থানা-পুলিশ করতেও ভয় পায় গ্রামের সাধারণ মানুষ। এরই
মধ্যে সেদিন রাতে পুবপাড়ার হারেজ আলীর একটা বলদ চুরি হয়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজি
করেও মিলল না। সবাই বুঝল এটা পটলা বাহিনীর কাজ। কিন্তু কেউ সরসরি কিছু বলতে পারছে
না। বললেই ঘাড় মটকে দেবে। গ্রামে টেকাই হবে দায় । কিন্তু এভাবে আর কদ্দিন? গ্রামের
মানুষ পটলা বাহিনীর জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চায়।না কিছুই হলো না। একদিন গভীর রাতে গ্রামে
আরেকটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যায়। অপহরণ। রাতে কারা যেন বোমা ফাটিয়ে বাড়ি থেকে এক
স্কুলছাত্রকে তুলে নিয়ে গেল। গ্রামজুড়ে তোলপাড়। এক সপ্তাহ পর স্কুলছাত্র আবদার
ফিরে এলো। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে। জানা গেল এও ছিল পটলা বাহিনীর কাজ।
আলু পটোল চুরি থেকে এইবার মানুষ অপহরণ। আঁতকে ওঠে গ্রামের তাবত লোক। এখন কী করা
যায়? চট করে বুদ্ধি খেলে যায় জুয়েলের মাথায়। অপহরণ হওয়া
আবদারের বন্ধু জুয়েল। জুয়েল ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সে এর একটা বিহিত চায়; চায়ই।
ওর নানা পুলিশ অফিসার। বরিশালে পোস্টিং। ছুটিতে এবার ওদের বাড়িতে আসবে। মোবাইলফোনে
নানুর সাথে কথা বলে ও। সেদিন বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যার পরপরই জুয়েলের নানা হাজির।
রাতে নানুর কাছে শুয়ে পটলা বাহিনীর অত্যাচারের কথা খুটে খুটে সব বলে সে। নানু কেউ যেন না জানে, তাহলে আমাদের
গ্রামছাড়া হতে হবে কিন্তু। নানাকে সাবধান করে দেয় জুয়েল। নানু হেসে বলেন, আরে জুয়েল
তুই কোনো চিন্তা করিস না। কাকপক্ষীও টের পাবে না। পটলা বাহিনী এক্কেবারে জেলে ঢুকে
যাবে। আর দেখিস গ্রামের সব অশান্তি দূর হয়ে যাবে। আমি সকালেই জেলা শহরে যাব এসপি
স্যারের কাছে। দেখিস কেমন লটোর পটোর লেগে যায়। নানুর কথা শুনে জুয়েল তো খুশিতে
আটখানা।সকালের নাস্তা সেরেই ওর নানা শহরে চলে
যান। সে উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। দেখা যাক নানুভাই কী করেন। আরও দু'দিন কেটে যায়। সেদিন সোমবার। সাত সকালে
গ্রামে হইচই। ছেলে-বুড়ো সবাই গ্রামের চৌরাস্তা পানে দৌড়াচ্ছে। কী হয়েছে? কেউই তেমন
সঠিক করে কিছু বলতে পারছে না। অনেকের সাথে চৌরাস্তার দিকে ছুটে যায় জুয়েলও। সে
দেখতে পায় জটলা। সেখানে কয়েকশ নারী-পুরুষের ভিড়। মানুষ ঠেলে ঠেলে সামনে এগোয় সে।
এবার যে দৃশ্য জুয়েল দেখলো, তাতে জুয়েলের আত্মা জুড়িয়ে যায়। একদল পুলিশ। তার
মাঝখানে হাত বাঁধা অবস্থায় ১০/১২ জন যুবক। তার মধ্যে রয়েছে অত্যাচারী পটলাও।
২০ মে ২০১৬ নিজবাড়ি, কোর্টপাড়া, চুয়াডাঙ্গা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন